দৃষ্টিগোচর সৌন্দর্য কি মস্তিষ্কের শক্তি ব্যয় কমাতে সাহায্য করে? ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত PNAS Nexus জার্নালের গবেষণায় এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে। গবেষকরা দেখেছেন, চোখে আরামদায়ক দৃশ্য দেখলে মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল প্রসেসিংয়ে কম শক্তি ব্যবহার হয়, ফলে তা স্বাভাবিকভাবে বেশি পছন্দের হয়ে ওঠে।
মস্তিষ্ক মানবদেহের সবচেয়ে শক্তি-সাপেক্ষ অঙ্গ, এবং ভিজ্যুয়াল তথ্য প্রক্রিয়াকরণে প্রায় অর্ধেক শক্তি ব্যয় হয়। এই প্রেক্ষাপটে ভিজ্যুয়াল সিস্টেম কীভাবে শক্তি সাশ্রয় করে তা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, তবে এই নতুন গবেষণায় সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের পছন্দের পিছনে শক্তি-সাশ্রয়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট ডির্ক বার্নহার্ড-ওয়ালথার এবং তার দল অনুমান করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ও অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম এড়াতে মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায় এমন দৃশ্যকে পছন্দ করে। এ ধরনের পছন্দকে “কগনিটিভ শর্টকাট” বলা যায়, যা জীবের বেঁচে থাকার জন্য উপকারী হতে পারে।
গবেষণার জন্য তারা পূর্বে সংগৃহীত একটি ফাংশনাল এমআরআই (fMRI) ডেটাসেট ব্যবহার করেন, যেখানে চারজন স্বেচ্ছাসেবক ৫,০০০টি ভিন্ন ছবি দেখেছিলেন এবং তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়েছিল। অক্সিজেনের ব্যবহার পরিমাপের মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে মেটাবলিক কার্যকলাপ নির্ণয় করা হয়। একই ছবিগুলোকে একটি কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কে চালিয়ে, বস্তু ও দৃশ্য শনাক্তকরণের জন্য প্রশিক্ষিত মডেলটি কতগুলো “নিউরন” সক্রিয় করে তা মাপা হয়, যা মানব মস্তিষ্কের শক্তি ব্যয়ের একটি অনুকরণ হিসেবে কাজ করে।
এরপর গবেষকরা এই দুই ধরনের মেটাবলিক ব্যয় (মানব ও কৃত্রিম) এবং ছবিগুলোর নান্দনিক রেটিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। ফলাফল দেখায়, যেসব ছবি মস্তিষ্কের জন্য কম শক্তি ব্যয় করে প্রক্রিয়াজাত হয়, সেগুলোকে অংশগ্রহণকারীরা বেশি সুন্দর বলে মূল্যায়ন করেছেন। অন্যদিকে, জটিল বা বিশৃঙ্খল চিত্রের ক্ষেত্রে শক্তি ব্যয় বেশি এবং নান্দনিক মূল্যায়ন কম।
এই ফলাফল নির্দেশ করে, দৃষ্টিগোচর সৌন্দর্য কেবল শিল্পের বিষয় নয়, বরং মস্তিষ্কের শক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সহজ, সুষম ও স্বাভাবিক রঙের দৃশ্য মস্তিষ্কের কাজের চাপ কমিয়ে দেয়, ফলে তা স্বাভাবিকভাবে বেশি পছন্দের হয়ে ওঠে। গবেষকরা উল্লেখ করেন, এই বৈশিষ্ট্যটি মানবের পরিবেশগত অভিযোজনের অংশ হতে পারে, যেখানে দ্রুত ও কম প্রচেষ্টায় তথ্য গ্রহণ করা বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে নকশা, স্থাপত্য ও শিল্পকলা ক্ষেত্রে এই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা উল্লেখ করেন। উদাহরণস্বরূপ, শহরের পাবলিক স্পেসে সহজ ও সুশৃঙ্খল ভিজ্যুয়াল উপাদান যুক্ত করলে বাসিন্দাদের মানসিক স্বস্তি ও মনোযোগ বাড়তে পারে। এছাড়া, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও থেরাপিতে সরল দৃশ্যের ব্যবহার রোগীর মস্তিষ্কের চাপ কমিয়ে আরাম প্রদান করতে পারে।
এই গবেষণার সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধুমাত্র চারজনের ডেটা ব্যবহার করা হয়েছে এবং ছবির রেটিং ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। তাই ভবিষ্যতে বৃহত্তর নমুনা ও বিভিন্ন সংস্কৃতির উপর গবেষণা চালিয়ে এই তত্ত্বকে আরও দৃঢ় করা প্রয়োজন। তবুও, বর্তমান ফলাফল দেখায় যে দৃষ্টিগোচর সৌন্দর্য ও মস্তিষ্কের শক্তি ব্যয়ের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায় এমন দৃশ্য মস্তিষ্কের শক্তি সাশ্রয় করে এবং তা স্বাভাবিকভাবে বেশি পছন্দের হয়। এই জ্ঞান আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, কাজের পরিবেশে এবং শিল্পকর্মে কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার। আপনি কি আপনার ঘর বা কর্মস্থলে এমন কিছু সহজ, সুষম ভিজ্যুয়াল উপাদান যুক্ত করতে প্রস্তুত? আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ছোট পরিবর্তনগুলো কীভাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে তা অন্বেষণ করুন।



