শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে লন্ডনে অবতরণ করেন। একই দিনে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন, যা নতুন গঠিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য একটি মূল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বৈঠকটি সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, ফোরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ প্রধান ইয়ান সাদারল্যান্ড, ডোনাল্ড মেইটল্যান্ড এবং অ্যালান সিমকক। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন শেখ মুজিব ও ড. কামাল হোসেন।
মিটিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করা। এডওয়ার্ড হিথের সরকার পূর্বে মুজিবের কারাবন্দি অবস্থায় তাকে মুক্ত করার জন্য যে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছিল, তার জন্য মুজিব বৈঠকের শুরুর মুহূর্তেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মুজিবের মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার চারটি দাবি মেনে নিয়েছেন এবং ২৪ মার্চ একটি সমাধান সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে সেই সময়ে তিনি প্রেসিডেন্টের টেলিফোনের অপেক্ষায় ছিলেন, যখন জানানো হয় যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণের পথে রয়েছে। এই তথ্য তাকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছিল, কারণ তিনি রক্তপাতের সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
মুজিবের মতে, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক উপায়ে করা উচিত। তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং মেশিনগান ব্যবহার তার নিজের বাড়িতে ঘটেছিল, যা তার গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে তার বাবা-মায়ের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এছাড়া, ঢাকায় স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বে বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের সময় গৃহহত্যা ঘটেছিল, যা তিনি নিন্দা করেন।
সেই রাতেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। রাত তিনটায়, কারাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মুজিবকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে যান, পরে তাকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের একটি আলাদা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
যখন জুলিয়াস নাভরো ভি. ভুট্টো সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনও ইয়াহিয়া মুজিবকে ফাঁসির জন্য চাপ চালিয়ে যান এবং পূর্বের আদেশে পেছনের তারিখ যুক্ত করে স্বাক্ষর করেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরবর্তী রাজনৈতিক জটিলতাকে উন্মোচিত করে।
বৈঠকের নথিপত্র সংগ্রহ ও বাংলা অনুবাদ কাজটি মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান সম্পন্ন করেন, যা ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষিত হবে।
এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বীকৃতি পেতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করেছে। ব্রিটেনের সঙ্গে এই কূটনৈতিক সংলাপের ফলস্বরূপ পরবর্তী বছরগুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলোও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
অধিকন্তু, মুজিবের এই বৈঠকে উপস্থিতি এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বৈঠকের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তার অবস্থান দৃঢ় করতে বিভিন্ন কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আজও দেশের বহিরাগত নীতি গঠনে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে।



