যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি নাগরিকের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন বন্ড (জামানত) শর্ত আরোপের বিষয়টি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের মন্তব্যের কেন্দ্রে এসেছে। তিনি বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় জানিয়েছেন যে, এই পদক্ষেপ দুঃখজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়, কারণ এটি বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশের জন্য প্রয়োগে রয়েছে।
উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়; ইমিগ্রেশন সমস্যাযুক্ত বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে তুলে ধরে বলেছেন যে, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ভিসা আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সর্বোচ্চ।
তিনি আরও বলেছিলেন, যদি এই বন্ড ব্যবস্থা গত এক বছরে প্রয়োগ হতো, তবে বর্তমান সরকারকে দায়ী ধরা হতো। তবে তিনি জোর দিয়ে বলছেন যে, এই পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে এবং তাই দায়িত্ব পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ওপরও পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুনভাবে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর জন্য বন্ডের শর্ত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। এই তালিকায় আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বাংলাদেশ, বেনিন, ভুটান, বতসোয়ানা, বুরুন্ডি, কাবো ভার্দে, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, কোট দিভোয়ার, কিউবা, জিবুতি, ডোমিনিকা, ফিজি, গ্যাবন, গাম্বিয়া, গিনি, গিনি-বিসাউ, কিরগিজস্তান, মালাউই, মৌরিতানিয়া, নামিবিয়া, নেপাল, নাইজেরিয়া, সাও টোমে ও প্রিন্সিপে, সেনেগাল, তাজিকিস্তান, তানজানিয়া, টোগো, টোঙ্গা, তুর্কমেনিস্তান, টুভালু, উগান্ডা এবং ভানুয়াতু অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি দেশের বন্ড শর্তের কার্যকর তারিখ তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, তালিকায় থাকা বেশিরভাগ দেশের বন্ড শর্ত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হবে, তবে কিছু দেশের জন্য তারিখ আগে নির্ধারিত হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ গাম্বিয়ার শর্ত ১১ অক্টোবর ২০২৫, মালাউইয়ের ২০ আগস্ট ২০২৫, এবং সাও টোমে ও প্রিন্সিপের ২৩ অক্টোবর ২০২৫।
এই নীতি পরিবর্তন বাংলাদেশি ভিসা আবেদনকারীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি করবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। বন্ডের পরিমাণ ও শর্তের বিশদ এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে পূর্বে একই ধরনের শর্ত আরোপিত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, আবেদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা ও খরচে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি নিয়ে গৃহীত পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে এবং ভিসা আবেদনকারীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা অনুসন্ধান করা হবে।
উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, বন্ড শর্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের আর্থিকভাবে বাধ্য করা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা ভিসা গ্রহণের হারকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি পরিবর্তনকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রাসঙ্গিক কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সমন্বয় করা হবে।
এই বন্ড শর্তের প্রয়োগের ফলে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে, যা পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের পরিমাণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত শিক্ষার্থী ও কর্মসংস্থান ভিত্তিক ভিসা আবেদনকারীদের জন্য এই শর্ত নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উদ্ভূত হবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি নতুন দেশগুলোর জন্য ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে, এবং বাংলাদেশও এতে অন্তর্ভুক্ত। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই পদক্ষেপকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন, তবে এটিকে অস্বাভাবিক নয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন, কারণ এটি দীর্ঘদিনের ইমিগ্রেশন নীতির ধারাবাহিকতা। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি এখন এই পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করে যথাযথ প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে কাজ করছে।



