যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স বুধবার একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বকে রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বলে উল্লেখ করেন। তিনি ডেনমার্ক এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সমালোচনা করেন। ভ্যান্সের মতে, এই অঞ্চলকে সুরক্ষিত করতে আর্থিক ও কৌশলগত বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্তি না করা কথাও উল্লেখ করেন।
হোয়াইট হাউসের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য ক্রয় নিয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আলোচনার সূচনা হয় এক সপ্তাহ আগে যখন ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছিল। হোয়াইট হাউসের মতে, ক্রয় প্রস্তাবটি কেবল একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়নি।
ডেনমার্ক, যা ন্যাটোর সদস্য, এই ধরনের কোনো প্রস্তাবকে ন্যাটো জোটের সমাপ্তি হিসেবে সতর্ক করেছে। ডেনমার্কের সরকার ও গ্রিনল্যান্ডের স্বশাসিত প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে দ্বীপটি বিক্রয়ের জন্য নয় এবং কোনো বিদেশি শক্তি দ্বারা অধিগ্রহণ করা যাবে না। এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের প্রতি কঠোর বিরোধিতা করা হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও আর্টিকের মধ্যে অবস্থিত, যা এটিকে প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা ও সামুদ্রিক নজরদারির জন্য আদর্শ করে তুলেছে। দ্বীপের কম জনসংখ্যা সত্ত্বেও, এর কৌশলগত গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভ্যান্সের মন্তব্য অনুসারে, যদি রাশিয়া বা চীন কোনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপে নিক্ষেপ করে, তবে গ্রিনল্যান্ডের সিস্টেমগুলো প্রথম সতর্কতা দেবে।
পিটুফিক স্পেস বেস, যা পূর্বে থুলে এয়ার বেস নামে পরিচিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এই বেসটি স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, রাডার পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তি সামরিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গ্রিনল্যান্ডের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে গ্রিনল্যান্ডের আকর্ষণও বাড়ছে। গলিত বরফের ফলে বিরল ধাতু, ইউরেনিয়াম, লোহার মতো খনিজের আহরণ সহজতর হয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য তেল ও গ্যাসের বড় রিজার্ভের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এই সম্পদগুলো কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেগুলি ভবিষ্যতে শক্তি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভ্যান্সের বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে পুরো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আংশিকভাবে গ্রিনল্যান্ডের উপর নির্ভরশীল। তিনি একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন যেখানে রাশিয়া বা চীন ইউরোপে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, তখন গ্রিনল্যান্ডের সতর্কতা ব্যবস্থা বিশ্বকে দ্রুত সতর্ক করবে। এই যুক্তি থেকে স্পষ্ট হয় যে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা অবহেলা করা হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ডেনমার্কের দৃষ্টিকোণ থেকে, তারা ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সামরিক ও নাগরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ন্যাটো প্রশিক্ষণ, রাডার আপগ্রেড এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি এসবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তবে ভ্যান্সের মতামত অনুসারে, এই প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত মানদণ্ডে পৌঁছায়নি এবং আরও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন।
আসন্ন মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার তীব্রতা বাড়তে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ক্রয় বা দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে জোর দেয়, তবে ন্যাটোর অভ্যন্তরে মতবিরোধ উন্মোচিত হতে পারে। অন্যদিকে, ডেনমার্কের কঠোর অবস্থান ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর স্বায়ত্তশাসন রক্ষার লক্ষ্যে দেখা যাচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের স্বশাসিত সরকারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়। তারা দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা চাহিদা এবং ইউরোপীয় অংশীদারিত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যতে আর্টিকের গলিত বরফ এবং সম্পদের উন্মোচন গ্রিনল্যান্ডকে ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে। এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র করতে পারে। তাই গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি গ্রিনল্যান্ডকে বৈশ্বিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মূল স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরলেও, ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। উভয় পক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনা ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো ন্যাটো জোটের ঐক্য ও আর্টিকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও বিক্রয় অযোগ্যতার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, তবে কৌশলগত প্রতিযোগিতার তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।



