অধিকাংশ দেশের নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে, সরকার আজ হায়ার রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে যে, জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা ২৯৫টি আইটেমে সম্প্রসারিত হয়েছে। এই আপডেটেড তালিকায় পূর্বের তুলনায় ১৩৬টি নতুন ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এদের বিক্রয় মূল্য সরকার নির্ধারিত সীমার বাইরে যাবে না।
ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই তালিকা ও ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতিমালা উভয়ই অনুমোদন করেছে। অনুমোদনের পর, তালিকাভুক্ত প্রতিটি ওষুধের সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা প্রয়োগ করা হবে, যেখানে কাঁচামাল (API ও এক্সিপিয়েন্ট), উৎপাদন ব্যয় এবং স্বাভাবিক মুনাফার হার বিবেচনা করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জনগণের চিকিৎসা সেবার প্রাপ্যতা ও ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার দাবি করে যে, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগীর আর্থিক বোঝা কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
জাতীয় ওষুধ নীতির সূচনা ১৯৮২ সালে হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশকে উৎসাহিত করা এবং সাধারণ মানুষের কাছে ওষুধ সহজলভ্য করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীতির কার্যকারিতা হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৯৪ সালে সব ওষুধের ওপর মূল্য নিয়ন্ত্রণ বাতিল করে মাত্র ১১৭টি ওষুধে সীমাবদ্ধ করা হয়।
প্রায় তিন দশক ধরে এই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায়, নিয়ন্ত্রিত তালিকার বাইরে থাকা ওষুধের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ে এবং বর্তমানে প্রায় ১,৩০০টি ওষুধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। এই বিস্তৃত তালিকা ওষুধের দামে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, যা রোগীর জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ওষুধের খরচে যায়, যার বেশিরভাগই ব্যক্তিগত পকেট থেকে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা বা সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো নেই, ফলে রোগীর আর্থিক সুরক্ষা সীমিত। এই বাস্তবতা বিবেচনা করে, অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প দেখা যায়নি।
নতুন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ২৯৫টি ওষুধের মধ্যে, পূর্বের তালিকার তুলনায় ১৩৬টি ওষুধের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার এই ওষুধগুলোকে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, এবং বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট ফর্মুলা অনুসরণ করা হবে। এতে কাঁচামালের খরচ, উৎপাদন প্রক্রিয়ার ব্যয় এবং স্বাভাবিক মুনাফার হার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলা অনুযায়ী, যদি কোনো কোম্পানির বর্তমান বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি হয়, তবে তাকে চার বছরের মধ্যে মূল্য সমন্বয় করতে হবে। এই সময়সীমা কোম্পানিগুলোর জন্য সমন্বয় প্রক্রিয়া সহজতর করার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত হয়েছে।
এই নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার আশা করে যে, ওষুধের দামের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং রোগীর আর্থিক বোঝা হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে, দেশীয় ওষুধ শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ কমিয়ে বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অবশেষে, স্বাস্থ্য সেক্টরে এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন রোগীর আস্থা বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের সময় পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে নীতি প্রত্যাশিত ফলাফল দিতে পারে।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন, এই নতুন মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে যথেষ্ট হবে, নাকি অতিরিক্ত পদক্ষেপের প্রয়োজন?



