১ জানুয়ারি রাত থেকে ৩ জানুয়ারি ভোর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলায় এক দ্রুতগতির অপারেশন চালায়। তিন ঘণ্টার মধ্যে মাদারোকে গ্রেপ্তার করে, কোনো আমেরিকান সৈনিকের ক্ষতি না ঘটিয়ে মিশন শেষ হয়। অপারেশনে প্রায় ১৫০টি বিমান সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয় এবং স্থল, আকাশ ও মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য ভেনেজুয়েলীয় সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া পূর্বাভাসে সহায়তা করে।
অপারেশন শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ার জেনারেল ড্যান কেইন মিশনকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নিখুঁত সমন্বয়ের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে কোনো এক উপাদানও ব্যর্থ হলে পুরো কাজটি ঝুঁকিতে পড়ত।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী ব্যাখ্যা অনুসারে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল মাদারোকে ড্রাগ ট্র্যাফিকিংয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করা, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারকে চীনের সমর্থন দিয়ে চালাচ্ছিলেন বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তারা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য হল ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সংরক্ষণে চীনের প্রভাব কমিয়ে নিজের স্বার্থ পুনরুদ্ধার করা। তেল ক্ষেত্রের কৌশলগত গুরুত্বকে সামনে রেখে, এই অপারেশনকে অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
একটি তৃতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত শক্তির প্রদর্শনী হিসেবেও দেখা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর এবং আধুনিক যুদ্ধের ডিজিটাল সরঞ্জামগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন।
এই তিনটি ব্যাখ্যা—ড্রাগ ট্র্যাফিক, তেল স্বার্থ এবং প্রযুক্তি প্রদর্শনী—মিলিয়ে দেখা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল থিম স্পষ্ট। তবে এই বিশ্লেষণগুলো একটি গভীরতর স্তরকে উপেক্ষা করে, যেখানে ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
বহু বছর ধরে ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু চীন তার নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থা ও মুদ্রা আন্তর্জাতিকীকরণে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ডলারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এখন কেবল আর্থিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তারও অংশ।
মধ্যপ্রাচ্য ঐতিহাসিকভাবে তেল রপ্তানি ও ডলার-নিয়ন্ত্রিত পেমেন্ট সিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল; এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই এই কাঠামোকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছে। তেল সরবরাহের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং তেল লেনদেনের মুদ্রা পদ্ধতি দুটোই ডলারের প্রভাবকে শক্তিশালী বা দুর্বল করতে পারে।
ভেনেজুয়েলা, যার তেল সংরক্ষণ বিশাল, এই দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত অপারেশন চীনের সঙ্গে তেল ও আর্থিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল ভূ-রাজনৈতিক গতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের তীব্রতা বাড়াবে, তেল বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থানে নতুন চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করবে। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তেল উৎপাদন ও রপ্তানি নীতি, এবং বৈশ্বিক আর্থিক নেটওয়ার্কের পুনর্গঠন এই সবই পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



