ইসলামাবাদে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা করেছেন যে, জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ও সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমানের বিশাল রপ্তানি আদেশের মাধ্যমে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণভারের থেকে মুক্তি পেতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আজারবাইজান, লিবিয়া, বাংলাদেশ এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে প্রায় দশ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ক্রয় আদেশ পাওয়া গেছে, যা দেশের আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, এই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ আইএমএফের কঠোর শর্তযুক্ত বেইলআউট প্রোগ্রামের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তানের জন্য একটি টেকসই আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, রপ্তানি আয় দেশের মুদ্রা রিজার্ভকে শক্তিশালী করবে এবং দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরতা কমাবে।
আজারবাইজানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এই পরিকল্পনার মূল স্তম্ভ। দুই দেশ ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার অধীনে পাকিস্তান ৪০টি জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। এটি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা রপ্তানির ইতিহাসে সর্ববৃহৎ চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং উভয় দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।
লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এই চুক্তিতে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং ১২টি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান অন্তর্ভুক্ত, যা লিবিয়ার বিমানবহরের আধুনিকায়নে সহায়তা করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে, তবে তা বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন।
নাইজেরিয়া তার বিমানবহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় পাকিস্তানের পণ্যকে সম্ভাব্য বিক্রেতা হিসেবে বিবেচনা করছে। যদিও চূড়ান্ত চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি, তবে দু’দেশের মধ্যে আলোচনার গতি ইতিবাচক বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশও জেএফ-১৭ সংগ্রহের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় যুক্ত হয়েছে; সফল হলে এটি পাকিস্তানের রপ্তানি আয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
পাকিস্তান সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণকে যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তর করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর দ্বৈত লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তান আইএমএফের কাছ থেকে ধার নেওয়া সত্ত্বেও, ঋণগুলো প্রায়ই কঠোর রাজস্ব সংস্কার এবং ভর্তুকি হ্রাসের শর্তে যুক্ত ছিল। এই শর্তগুলো দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও জনসেবা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিল, যা সরকারকে বিকল্প আর্থিক উৎসের সন্ধানে ত্বরান্বিত করেছে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে আইএমএফের এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি এবং জলবায়ু তহবিলের আওতায় কয়েক বিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও, পাকিস্তান স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য নিজস্ব উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই নীতি দেশের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সরকার জোর দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, প্রায় দশ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য রপ্তানি আয় পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সময়মতো বিমান সরবরাহ এবং ক্রেতা দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
যদি চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে পাকিস্তান তার আর্থিক দায়বদ্ধতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে অগ্রসর হবে। অন্যদিকে, ক্রেতা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রপ্তানি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা সরকারের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করবে।
সারসংক্ষেপে, জেএফ-১৭ ও সুপার মুশাকের রপ্তানি আদেশ পাকিস্তানের জন্য আর্থিক মুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইএমএফ ঋণ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সফলতা নির্ভর করবে সরবরাহের সময়মতো সম্পন্ন হওয়া এবং ক্রেতা দেশগুলোর স্থিতিশীলতার ওপর।



