দিয়াবাড়ী, উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ ক্যাম্পাসে গত বছর ২১ জুলাই ঘটিত বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের ধ্বংসাত্মক ধাক্কা ৩৬ জনের মৃত্যু এবং ১৭২ জনের আঘাতের কারণ হয়। দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিয়নের ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) এর আয়োজনে একটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের দাবিগুলো প্রকাশ করে।
সম্মেলনে পরিবারগুলোর প্রতিনিধিরা পাইলটের উড়ান সংক্রান্ত ত্রুটি, বিমানবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের ভবন নির্মাণে গৃহীত অনিয়মকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সকলকে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানায়। তদুপরি, প্রাক্তন বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানের (অব.) ৩০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে সেই অর্থ পুনরুদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করারও দাবি করা হয়।
দ্বিতীয় দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশনে উল্লিখিত নিয়ম অনুযায়ী শোক পরিবারগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয় দাবিতে নিহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ‘শহীদী মর্যাদা’ প্রদান, শহীদ সনদ জারি এবং তাদের স্মৃতিতে একটি স্মারক স্থাপন করা অন্তর্ভুক্ত।
চতুর্থ দাবিতে প্রতি বছর ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণার পাশাপাশি উত্তরায় একটি আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের কবরের দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত। পঞ্চম দাবিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন, মানসিক ও শারীরিক সহায়তা প্রদান করা চাওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার সময় দুপুর ১টা ১২ মিনিটে বিমানটি ক্যাম্পাসের ওপর আছড়ে পড়ে, ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা আগুনে পুড়ে ও ধ্বংস হয়ে যায়। উপস্থিত পরিবার প্রতিনিধিরা এই দৃশ্য বর্ণনা করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দলিলভিত্তিক তদন্ত রিপোর্টে পাইলটের উড়ান ত্রুটি, বিমান রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের ভবন কোড অমান্য করা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য বিমানবাহিনীর বাজেট থেকে দুর্নীতি না থাকত, তবে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হতো।
দলিল অনুযায়ী পাইলটসহ মোট ৩৬ জনের মৃত্যু এবং ১৭২ জনের আঘাতের পেছনে দুর্নীতির সরাসরি প্রভাব রয়েছে বলে পরিবারগুলো দাবি করে। তারা অতিরিক্তভাবে মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের ভবন কোড লঙ্ঘনকে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ানোর আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।
অধিক তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্তের পূর্ণ প্রতিবেদন উপস্থাপন এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন চলমান, যেখানে শোক পরিবারগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার জন্য আদেশ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিমানবাহিনীর দিক থেকে তদন্তের ফলাফল অনুসারে পাইলটের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ প্রোটোকল এবং বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের ভবন নির্মাণে গৃহীত অনুমোদন প্রক্রিয়ার পুনর্মূল্যায়ন এবং ভবন কোডের কঠোর প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপরই সরকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন এই ঘটনার শোক প্রকাশ করে এবং শোক পরিবারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরির প্রতিশ্রুতি জানায়। তবে পরিবারগুলো দাবি করে যে, শুধুমাত্র পুনর্বাসনই যথেষ্ট নয়; দুর্নীতির মূল কারণ উন্মোচন এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনি দায়িত্বে টানা জরুরি।
এই ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সামরিক বিমান ধ্বংসের ফলে এত বড় প্রাণহানির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ নীতি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মানদণ্ডের কঠোর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনের পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরবর্তী আদালত শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে পরিবারগুলোর দাবিগুলো আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হবে। শোক পরিবারগুলো এই শুনানিতে তাদের দাবি পূরণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার আশায় রয়েছে।



