ঢাকা মহানগরের উত্তরা ও নিকুঞ্জ এলাকায় চীনা নাগরিকদের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা একটি অবৈধ আইফোন সংযোজন কারখানা ধ্বংস করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বুধবার (৭ জানুয়ারি) এই অভিযানে দুই চীনা নাগরিকসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে আইফোন তৈরি করে বাজারে আসল ফোনের ছদ্মবেশে বিক্রি করছিল।
অভিযানের সময় ৩৬৩টি বিভিন্ন মডেলের আইফোন, বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ এবং মোবাইল তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ডিবি জানায়, এই চক্রটি প্রায় দেড় বছর ধরে গোপন ল্যাবে অবৈধভাবে ফোন সংযোজন করে সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা চালিয়ে আসছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টর ও নিকুঞ্জ‑১ এলাকায় একযোগে অভিযান চালানোর কথা জানান। উত্তরা থেকে একজনকে ৫৮টি আইফোনসহ এবং নিকুঞ্জ থেকে দুই চীনা নাগরিককে ৩০৫টি ফোনসহ আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারকালে অবৈধ মোবাইল ও সংযোজন যন্ত্রের পাশাপাশি হেফাজতে বিদেশি মদও উদ্ধার করা হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, চক্রটি বিদেশ থেকে আলাদাভাবে পার্টস এনে ঢাকার গোপন ল্যাবে নিখুঁতভাবে সংযোজন করে আসল আইফোনের মতো বাজারে ছড়িয়ে দিত।
প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই প্রতারক চক্রটি গত ১৮ মাস ধরে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে এবং ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ ভুয়া আইফোন দেশের বাজারে সরবরাহ করেছে। ডিবি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, চক্রের সঙ্গে যুক্ত কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের নাম পাওয়া গেছে, তবে তদন্তের স্বার্থে তা এখনো প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
পুলিশের মতে, এই চক্রের সদস্যরা আইফোনের আদলে ভুয়া ফোন তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত এবং অনেক ক্ষেত্রে তা চড়া দামে আসল ফোনের মতো বিক্রি করত। ফলে গ্রাহকরা উচ্চ মূল্যে নকল পণ্য কিনে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছিল।
মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল সাধারণ জনগণকে সতর্ক করেছেন যে, কম দামে ‘অরিজিনাল আইফোন’ কেনার প্রলোভন থেকে দূরে থাকা উচিত। তিনি অনুরোধ করেন যে, ক্রেতারা অনুমোদিত শোরুম বা বিশ্বস্ত বিক্রেতা ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে মোবাইল ফোন কেনা থেকে বিরত থাকুন।
ডিবি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারকৃতদের হেফাজতে থাকা যন্ত্রাংশ ও মদ সহ সবকিছু ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। ভবিষ্যতে এই চক্রের কার্যক্রমের সম্পূর্ণ রূপ প্রকাশের জন্য অতিরিক্ত তদন্ত চালু রাখা হয়েছে।
অভিযানের পর ডিবি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত পেট্রোলিং চালু করেছে। এছাড়া, আইফোনের নকল পণ্যের বাজারে প্রবেশ রোধে ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইন চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আইনি দিক থেকে, গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে অপরাধের শাস্তি দেওয়ার জন্য আদালতে হাজির করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকি, জাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়, এবং মদ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ডিবি আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে অনুরূপ অবৈধ কারখানা ধ্বংসের জন্য গোয়েন্দা বিভাগে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এই টাস্কফোর্সের কাজ হবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নকল ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রয় চক্র সনাক্ত করা এবং তা দ্রুত বন্ধ করা।
অভিযানের সময় উদ্ধার করা যন্ত্রাংশের তালিকায় আইফোনের মূল বোর্ড, ক্যামেরা মডিউল, ব্যাটারি এবং স্ক্রিন অ্যাসেম্বলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব অংশের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, বেশিরভাগ অংশই চীন থেকে সরাসরি আনা হয়েছিল, যা দেশের কাস্টমস নিয়ম লঙ্ঘনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ডিবি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, এই ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দেশের ভোক্তা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। তারা বলছেন, নকল পণ্যের বাজারে প্রবেশ রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ত্বরিত পদক্ষেপ এবং জনসাধারণের সচেতনতা দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযানের পর ডিবি একটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ করে, যেখানে ভবিষ্যতে নকল ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রয় বন্ধ করার জন্য আইন প্রয়োগের কঠোরতা বাড়ানো হবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া, ভোক্তাদের জন্য সঠিক তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে নকল পণ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে।
এই ঘটনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধী গোষ্ঠী স্থানীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের বাজারে নকল পণ্য প্রবেশ করাতে সক্ষম। তাই, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
ডিবি শেষ পর্যন্ত বলেছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে এবং দেশের ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বজায় রাখবে।



