ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ২০২২ সালে ‘অপরাজেয় ৭১‑অদম্য ২৪’ প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলেন বি এম ফাহমিদা আলম। নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালীন তিনি অনলাইন আক্রমণের শিকার হন এবং গৃহহিংসা, গায়ে দুর্গন্ধ, গোসল না করা ইত্যাদি হুমকি পেতে শুরু করেন।
ডিসমিসল্যাবের ২০২৩ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডাকসু নির্বাচনে আলোচিত পাঁচ নারী প্রার্থীর মধ্যে ফাহমিদা আলম সামাজিক মিডিয়ায় সর্বাধিক বিদ্বেষ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ‘গণধর্ষণ’সহ বিভিন্ন হুমকিমূলক মন্তব্য করা হয়, যা তাকে এবং তার পরিবারকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।
২০২৪ সালের জানুয়ারি ৩ তারিখে তিনি প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময়ে উগ্র গোষ্ঠী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যৌন নিপীড়নমূলক মন্তব্য করে। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের হুমকি তার পরিবারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এবং বহু লোক তাকে রাজনীতি ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে।
ফাহমিদা আলমের অভিজ্ঞতা একা নয়; ২০২৫ সালে রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের পাশাপাশি সংস্কৃতি কর্মী, নারী খেলোয়াড়, উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীরাও অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ২৩ বছর বয়সী নারী ফুটবল খেলোয়াড় মাতসুশিমা সুমাইয়া তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সম্পূর্ণ বছরের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে, গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা এই সময়ে দায়ের হয়েছে।
অনলাইন হুমকির পাশাপাশি বাস্তব জীবনে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বাড়িতে অনুপ্রবেশ করে ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনা, পাশাপাশি বাসে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের পর কিছু গোষ্ঠী নির্দিষ্ট সুপারিশের বিরোধিতা করে। এই বিরোধের মধ্যে কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের ওপর আক্রমণমূলক মন্তব্য করা হয়। বছরের শেষের দিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে অপমানজনক মন্তব্য করেন, যা নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাকে তীব্র করে তুলেছে।
পুলিশ বর্তমানে অনলাইন হুমকি, বাড়িতে অনুপ্রবেশ, বাসে নিপীড়নসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বেশিরভাগই এখনো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।
অধিকাংশ অভিযোগের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; কিছু মামলায় অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালতে দায়ের করা হবে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা নারীর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অপরিহার্য।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা বৃদ্ধি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালীকরণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখায়, এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে সময় ও সম্পদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালে অনলাইন ও বাস্তব জগতে নারীর নিরাপত্তা হুমকির মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আদালতের রায়ের অপেক্ষা চলমান, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের হিংসা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



