বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগে দৈনিক ২০টি যাত্রীবাহী ট্রেন (১০টি ইন্টারসিটি, ৮টি মেইল ও ২টি লোকাল) চালানো হচ্ছে। তবে ইঞ্জিনের ঘাটতির কারণে ১৬টি ইঞ্জিনের সেবা সময়সীমা ইতিমধ্যেই শেষ, কিছু দশকেরও বেশি অতিবাহিত হয়েছে। রেকর্ডে দেখা যায়, এই বিভাগে ন্যূনতম ৩০টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে মাত্র ২২টি আছে; বাকি ছয়টির মধ্যে একটিও দুর্ঘটনার পর মেরামত না হয়ে পার্বতিপুর রেলওয়ে কর্মশালায় আটকে আছে।
ইঞ্জিনের বয়স বাড়ার ফলে ট্রেনের অপ্রত্যাশিত বন্ধ হওয়া, মাঝপথে শক্তি হারানো এবং সময়সূচি ভাঙা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মীদের মতে, পুরনো ইঞ্জিনে যাত্রীবাহী সেবা চালানো নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এবং রেলওয়ের সুনাম ক্ষয় করে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বিভাগীয় লোকোমোটিভ মাস্টাররা বহুবার নতুন ইঞ্জিনের অনুরোধ জানিয়েও কোনো সাড়া পাননি, ফলে দেরি ও ব্যাঘাত সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লালমনিরহাটের রেলওয়ে কর্মী সাইফুল ইসলাম জানান, ধারাবাহিক ব্রেকডাউন কারণে কিছু মেইল ও লোকাল ট্রেন ইতিমধ্যে সেবার বাইরে চলে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ইঞ্জিনের অবস্থা উন্নত না হয় তবে আরও বেশি সেবা বন্ধ হতে পারে, যা উত্তরাঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বড় ধাক্কা হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পসো সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনিরের মতে, সেবা সময়সীমা অতিক্রান্ত ইঞ্জিনগুলো ধারাবাহিকভাবে চালালে যান্ত্রিক ত্রুটি অনিবার্য এবং নির্ধারিত গতি বজায় রাখা কঠিন হয়। ফলে ট্রেনের সময়মত পৌঁছানো ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সামগ্রিক দক্ষতা হ্রাস পায়।
বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ধিমন ভূমিক উল্লেখ করেন, দেশের জুড়ে ইঞ্জিনের ঘাটতি রয়েছে, তবে লালমনিরহাটে পরিস্থিতি বিশেষভাবে খারাপ। তিনি ইঙ্গিত করেন, এই ঘাটতি রেলওয়ের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে, কারণ ট্রেনের দেরি ও বন্ধের ফলে টিকিট বিক্রয় ও পণ্য পরিবহনের আয় কমে যায়, একইসাথে রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি মেরামতের খরচ বাড়ে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, উত্তরের প্রধান শহর ও গ্রামাঞ্চল রেলপথের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে রোড নেটওয়ার্কের বিকল্প সীমিত। ইঞ্জিনের পুরনো অবস্থা ও সেবার অনিয়মিততা পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ঘটিয়ে উৎপাদন খাতের খরচ বাড়ায় এবং স্থানীয় ব্যবসার লভ্যাংশ কমায়। এছাড়া, যাত্রীদের জন্য বিকল্প পরিবহন খরচ বাড়ে, যা পরিবারিক ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
বাজারে রেলওয়ে সেবা অবহেলিত হলে, বেসরকারি পরিবহন সংস্থার চাহিদা বাড়তে পারে, ফলে রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদী আয় হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে, রেলওয়ে সেক্টরে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যাবে, কারণ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেবে না।
প্রশাসনিক দিক থেকে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দ্রুত নতুন ইঞ্জিনের ক্রয় ও পুরনো ইঞ্জিনের পরিবর্তন না করলে, সরকারী বাজেটের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, কারণ জরুরি মেরামত ও দুর্ঘটনা মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত তহবিল প্রয়োজন হবে। এছাড়া, নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে, রেলওয়ের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস কমে যাবে।
সারসংক্ষেপে, লালমনিরহাট বিভাগে পুরনো ইঞ্জিনের ব্যবহার রেলওয়ের সেবা মান, নিরাপত্তা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অবিলম্বে নতুন ইঞ্জিনের সরবরাহ ও বিদ্যমান ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ শক্তিশালী না করা হলে, উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা, বাণিজ্য ও দৈনন্দিন যাতায়াতের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকার ও রেলওয়ে ব্যবস্থাপনা উভয়েরই এই সংকট সমাধানে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে রেলপথের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবাহ অব্যাহত থাকে এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।



