যুক্তরাষ্ট্রের তেল বাজারে আধিপত্য বজায় রাখতে ইরান, ইরাক, লিবিয়া এবং ভেনেজুয়েলা সহ বেশ কয়েকটি দেশের ওপর দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। এই দেশগুলোতে তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকান নীতি কীভাবে গড়ে উঠেছে, তা ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট।
ইরানের ক্ষেত্রে প্রথম বড় সংঘাতের সূত্রপাত ১৯৫১ সালে হয়, যখন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেক তেল শিল্পের জাতীয়করণ ঘোষণা করেন। এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এবং ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬সের বিরোধিতা তীব্র হয় এবং পরবর্তীতে অপারেশন আজাক্সের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে শাহ রেজা পেহলভিকে ক্ষমতায় আনা হয়।
শাহের শাসনামলে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোকে স্বাধীনভাবে তেল উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়, ফলে ইরানের তেল রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর শাসন পরিবর্তন হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এবং তেল রপ্তানি সীমাবদ্ধতা ইরানের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে রাখে।
ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নতুন মোড় আসে ২০০০ সালে, যখন সাদ্দাম হোসেন ডলারের বদলে ইউরোতে তেল বিক্রি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই সিদ্ধান্তকে আমেরিকান নীতি তেল বাজারে ডলারকে প্রধান মুদ্রা হিসেবে বজায় রাখার হুমকি হিসেবে দেখেছে এবং তদনুযায়ী ইরাকের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়।
উত্তর আফ্রিকার লিবিয়ার তেল ক্ষেত্রেও একই ধরনের হস্তক্ষেপের রেকর্ড রয়েছে। ২০১১ সালের গৃহযুদ্ধের পর লিবিয়ার তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অস্থির হয়ে পড়ে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোকে তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আবার শিরোনামে উঠে আসে। ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সংরক্ষণকে লক্ষ্য করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে ভেনেজুয়েলার উচ্চমানের তেল এবং তার আয় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, এবং দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়। তেল সংরক্ষণকে নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আন্তর্জাতিক তেল বাজারে ডলারের একাধিপত্য বজায় রাখতে চায়।
এই সব ঘটনা একত্রে দেখায় যে, তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন দেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক উপায়ে প্রভাবিত করেছে। তেল বাজারে ডলারের অবস্থান রক্ষা করা, তেল মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং তেল রপ্তানির মাধ্যমে জিও-অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
ইরান, ইরাক, লিবিয়া এবং ভেনেজুয়েলা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পদ্ধতি ভিন্ন হলেও মূল লক্ষ্য একই: তেল সম্পদের ওপর সরাসরি বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ। এই নীতি দেশীয় শাসনব্যবস্থার স্বায়ত্তশাসনকে প্রভাবিত করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়ায়।
অধিকন্তু, তেল বাজারে ডলারের আধিপত্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশলগুলোকে তেল-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা, চুক্তি এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই পদ্ধতি গ্লোবাল অর্থনীতিতে তেল মূল্যের ওঠানামা এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
ভবিষ্যতে তেল বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক শক্তির উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের তেল-নির্ভর কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে তেল সম্পদ সমৃদ্ধ দেশগুলোতে এখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শক্তি প্রতিযোগিতা বিদ্যমান, যা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বজায় রাখে।
সারসংক্ষেপে, ইরান থেকে ভেনেজুয়েলা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের তেল নীতি আন্তর্জাতিক শক্তি সমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কূটনৈতিক প্রভাবের সমন্বয়। তেল বাজারে ডলারের একাধিপত্য রক্ষার জন্য এই দেশগুলোতে হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবেশে অতিরিক্ত অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপের সম্ভাবনা বাড়বে।



