ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত ফেনি জেলার পারশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা গুলোতে ভারতীয় মোবাইল সিমের ব্যবহার দীর্ঘদিন থেকে চলমান। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে এই সিমগুলো অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সম্প্রতি ফেনি সদরসহ চারটি উপজেলায়ও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চোরাকারবারি গোষ্ঠীও এই সিমগুলো ব্যবহার করে অপরাধমূলক কাজ চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিমের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে গেমিং, সামাজিক মিডিয়া ও অন্যান্য অনলাইন সেবা গ্রহণের সংখ্যা বাড়ছে, যা নিরাপত্তা সংস্থার দৃষ্টিতে উদ্বেগের কারণ।
সীমান্তের কিছু গ্রাম পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ও মহামায়া ইউনিয়নের, ফুলগাজী উপজেলার সদর, আমজাদহাট, আনন্দপুর, মুন্সীরহাট ইউনিয়নের এবং পারশুরাম উপজেলার চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ও মির্জানগরের গ্রামগুলোতে ভারতীয় সিমের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী গ্রাহক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এই ব্যবহারকারীরা গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সেবা উপভোগ করছেন।
স্থানীয় তরুণরা জানান, দেশের নিজস্ব মোবাইল নেটওয়ার্কের কভারেজ ও গতি দুর্বল হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ভারতীয় সিম ব্যবহার করে। এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন, রিলায়েন্স ইত্যাদি ভারতীয় অপারেটরের সিম তাদের মোবাইলে সক্রিয় রয়েছে। ফলে তারা ফ্রি-ফায়ার, পাবজি ইত্যাদি অনলাইন গেমের পাশাপাশি সামাজিক মিডিয়ায় সক্রিয়।
ফুলগাজী উপজেলার বিএনপি সদস্যসচিব আবুল হোসেন ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, পূর্বে প্রশাসনকে ভারতীয় সিমের ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো হয়েছে এবং এটি দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। তিনি সমাধানের দাবি জানান।
পারশুরাম উপজেলার বিএনপি সদস্যসচিব মনির চেয়ারম্যানের মতে, সিম ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। তিনি এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
ছাগলনাইয়া উপজেলার বিএনপি সদস্যসচিব আলমগীর বিএ বলেন, এই সিমগুলো অনৈতিক লোকেরা ব্যবহার করে দেশের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করতে চায়। তিনি সরকারী হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
অধিকন্তু, আমজাদহাট ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও জামায়াতে ইসলামী আমির ইব্রাহিম মজুমদার উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভারতীয় সিম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
প্রযুক্তি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী এলাকায় আন্তর্জাতিক সিমের প্রবেশ দেশীয় টেলিকম নেটওয়ার্কের সিগন্যাল দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি প্রকাশ করে। বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এই ধরনের অননুমোদিত সিমের ব্যবহার রোধে নীতি প্রণয়ন ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে পারে।
ইন্ডিয়ান অপারেটরদের নেটওয়ার্কের কভারেজ ও ডেটা প্যাকেজের তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে সীমান্তবর্তী গ্রাহকদের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধা দেশের সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রযুক্তিগতভাবে, সিম কার্ডের রেজিস্ট্রেশন ও ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শক্তিশালী না হলে অপরাধীরা সহজে ভুয়া পরিচয় দিয়ে সেবা গ্রহণ করতে পারে। তাই সিমের মালিকানা যাচাই, জিওলোকেশন ট্র্যাকিং ও ক্রস-বর্ডার ডেটা শেয়ারিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তীব্র।
সীমান্তে সিমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন, বিটিআরসি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। সঠিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গড়ে তোলা, সিগন্যাল শক্তিশালী করা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।



