ইন্টারিম সরকার গতকাল শিল্প, বাণিজ্য ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠকের পর ১০টি বড় প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত জানায়। এতে স্থানীয় ও বহুজাতিক উভয় ধরণের কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত, যার লক্ষ্য বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়িয়ে অর্থনীতির মূলধনী কাঠামোকে শক্তিশালী করা।
আর্থিক উপদেষ্টা সালেহুদ্দিন আহমেদ বৈঠকে উল্লেখ করেন, শেয়ারবাজারে রাষ্ট্র-স্বত্বাধীন ও বহুজাতিক সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়লে মূলধন সংগ্রহের খরচ কমবে এবং বাজারের তরলতা বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো রাষ্ট্র-স্বত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিছু অংশ বিক্রি করার প্রস্তুতি নিয়েছে।
সরকারের তালিকাভুক্তির জন্য চিহ্নিত দশটি সংস্থা হল: ইউনিলিভার, নেসলে, নোভার্টিস, সিংগেন্টা, সিনোভিয়া (পূর্বে সানোফি বাংলাদেশ), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন। এসব সংস্থার বোর্ডগুলো এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে, তবে তারা নীতিগতভাবে তালিকাভুক্তির দিকে এগোতে ইচ্ছুক বলে জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক নয়; তবে বোর্ডের সিদ্ধান্তের উপর সরকারী চাপ বাড়বে। “বোর্ডগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে” বলে উপদেষ্টা জানান। এই পদক্ষেপের পেছনে মন্ত্রণালয়গুলো শেয়ার বিক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত তরলতা আনতে চায়, যা বিনিয়োগকারীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে শেয়ারবাজারের ক্যাপিটালাইজেশন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে বহুজাতিক সংস্থার তালিকাভুক্তি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং দেশের রেটিং সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, রাষ্ট্র-স্বত্বাধীন সংস্থার শেয়ার বিক্রয় সরকারী আয় বাড়িয়ে আর্থিক ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এর চেয়ারম্যান আবু আহমেদ এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে তালিকাভুক্তির জন্য স্পষ্ট সংকেত দেওয়া হয়েছে, এবং রাষ্ট্র-স্বত্বাধীন সংস্থার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলো তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। এখন কেবল বোর্ডের দ্রুত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা বাকি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, নেসলে যদি বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারে, তবে দেশের শেয়ারবাজারের আন্তর্জাতিক মানোন্নয়ন সম্ভব।
তালিকাভুক্তির সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। প্রথমত, শেয়ারবাজারে নতুন বড় খেলোয়াড়ের প্রবেশে মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা ছোট বিনিয়োগকারীর জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র-স্বত্বাধীন সংস্থার শেয়ার বিক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করা জরুরি, না হলে জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তৃতীয়ত, বহুজাতিক সংস্থার তালিকাভুক্তি তাদের মূলধন কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও স্থানীয় সরবরাহ চেইনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, সরকার যে সংকেত দিয়েছে তা দেশের মূলধনী বাজারকে আধুনিকায়নের দিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যদি তালিকাভুক্তি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে শেয়ারবাজারের লিকুইডিটি বাড়বে, নতুন IPO-র জন্য প্রস্তুতি নেবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আগ্রহ আকৃষ্ট হবে। তবে সফলতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, শেয়ার মূল্যায়নের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এই উদ্যোগের পরবর্তী ধাপ হবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং শেয়ার বিক্রয়ের নির্দিষ্ট শর্তাবলী নির্ধারণ। সরকার ইতিমধ্যে তালিকাভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রস্তুত করার কথা জানিয়েছে, যা শেয়ারবাজারের কার্যকরীতা ও স্বচ্ছতা বাড়াবে। ভবিষ্যতে যদি এই দশটি সংস্থা শেয়ারবাজারে সফলভাবে তালিকাভুক্ত হয়, তবে তা দেশের আর্থিক বাজারের গভীরতা ও প্রস্থকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।



