ওয়াশিংটন – যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার হোয়াইট হাউসের একটি স্মারক মাধ্যমে জাতিসংঘের মূল জলবায়ু চুক্তি এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মূল্যায়ন সংস্থাকে ত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই পদক্ষেপটি দেশের স্বার্থের বিরোধী হিসেবে বিবেচিত ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
স্মারকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে গৃহীত নীতি ও চুক্তিগুলো থেকে সরে দাঁড়ানো প্রয়োজন, এবং এতে পরিবেশ, মানবাধিকার, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা সংস্থাগুলো অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখিত ৬৬টি সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (UNFCCC), যা আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির ভিত্তি গঠন করে।
UNFCCC ১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিটে গৃহীত হয় এবং একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সেনেটের অনুমোদন পায়। এই চুক্তি পরবর্তীতে প্যারিস চুক্তি সহ বহু আন্তর্জাতিক জলবায়ু সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ট্রাম্পের প্রশাসন ফসিল জ্বালানির ওপর জোর দেয় এবং মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নকে অস্বীকার করে, যা গত সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ শীর্ষ সম্মেলনে প্রকাশ্যভাবে “একটি ধোঁকাবাজি” বলে সমালোচনা করা হয়।
সংবিধানের ধারা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন, তবে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, ফলে এই পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের পূর্ববর্তী মেয়াদে প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনে পুনরায় যুক্ত করা হয়।
UNFCCC থেকে প্রত্যাহার করা হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় যোগদানের পথ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানো মানে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতার মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, যা দেশের পরিবেশ নীতি ও বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির ওপর প্রশ্ন তুলবে।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের একজন বিজ্ঞানী ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে “একটি নতুন নিম্ন স্তর” বলে বর্ণনা করেন এবং উল্লেখ করেন যে এই প্রশাসন বৈজ্ঞানিক সত্যকে উপেক্ষা করে জনগণের স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলছে।
স্মারকে আরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC) থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সংক্রান্ত গবেষণা ও রিপোর্টের প্রধান সংস্থা। IPCC ত্যাগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রবেশ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ সীমিত হবে।
এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিসরে প্রভাব বিস্তৃত হতে পারে। পার্লামেন্টে এবং বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থায় এই প্রত্যাহারকে সমালোচনা করা হয়েছে, আর কিছু কনজারভেটিভ গোষ্ঠী এটিকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানায়।
আইনি দিক থেকে, সংবিধানের অনির্দিষ্টতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হওয়ায় আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা উঁচু। ভবিষ্যতে কোনো নতুন প্রশাসন যদি পুনরায় যুক্ত হতে চায়, তবে পূর্বের প্রত্যাহারকে রদবদল করা কঠিন হতে পারে।
প্রশাসনের এই ব্যাপক প্রত্যাহার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় সমন্বিত প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। পরবর্তী ধাপে হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য নীতি সমন্বয় এবং কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করবে যে এই পদক্ষেপের পরিণতি কীভাবে গৃহীত হবে।
সংক্ষেপে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রধান জলবায়ু চুক্তি ও বৈজ্ঞানিক সংস্থা থেকে সরিয়ে দেয়, যা আইনি অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষতি এবং দেশীয় রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন পর্যায় উন্মোচন করেছে।



