রপ্তানি করতে ইচ্ছুক উদ্যোক্তাদের জন্য অনুমোদন, নথিপত্র, লজিস্টিক্স এবং বাজার গবেষণার জটিলতা প্রায়শই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরণের বাধা দূর করতে ২০২২ সালে এক্সপোর্ট সেবা নামের একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা জাহিদ হোসেন, রপ্তানি ক্ষেত্রে দুই দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে, পূর্বে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রপ্তানি দলের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন।
সংস্থাটি উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ রপ্তানি চক্র—অনুমোদন সংগ্রহ থেকে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহন পর্যন্ত—একই ছাদের নিচে সমন্বিত সেবা প্রদান করে। এই মডেলটি বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা প্রায়শই প্রয়োজনীয় নথি ও লজিস্টিক্সের জটিলতা সামলাতে অক্ষম থাকে।
এ পর্যন্ত এক্সপোর্ট সেবা প্রায় দশ হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় দশ শতাংশ, অর্থাৎ এক হাজারের বেশি উদ্যোক্তা, ইতিমধ্যে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করছে, আর অন্যরা রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংস্থা এছাড়াও কর্পোরেট গ্রাহকদের জন্য পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করে, যা বৃহৎ পরিসরের রপ্তানি প্রকল্পে দক্ষতা বাড়ায়।
সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী, পঞ্চাশের বেশি প্রতিষ্ঠান এক্সপোর্ট সেবার মাধ্যমে মোট ১২০টির বেশি পণ্য ১৭টি দেশে রপ্তানি করেছে। এই সংখ্যাগুলি দেশীয় উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করেছে এবং রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে।
এক্সপোর্ট সেবার কর্মীসংখ্যা বর্তমানে দশজন, তবে তাদের কাজের পরিধি বিস্তৃত। তারা ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে পণ্য লাইসেন্স ও পরিবহন সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করে। এই সেবা গুলো উদ্যোক্তাদের রপ্তানি প্রক্রিয়ার সময় আর্থিক ও সময়গত ব্যয় কমিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠাতা জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেছেন যে, এমএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজের সময় তিনি লক্ষ্য করেন বেশিরভাগ উদ্যোক্তা রপ্তানির প্রাথমিক সনদ বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অপরিচিত। যদিও দেশের কৃষি, পাট ও হস্তশিল্প পণ্যের মান আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃত, তবু যথাযথ নথিপত্রের অভাবে রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ফাঁক পূরণে এক্সপোর্ট সেবা একটি বিনামূল্যের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করার পরিকল্পনা করেছে, যেখানে রপ্তানি প্রক্রিয়ার সব ধাপ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে। এই উদ্যোগের জন্য সংস্থা এসএমই ফাউন্ডেশন, ইপিবি এবং ব্র্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, রপ্তানি সেবার মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে, ফলে দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে পাট, হস্তশিল্প এবং কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে, যা দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক।
তবে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় এখনও কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে। লজিস্টিক্সের খরচ, বৈদেশিক মুদ্রা ওঠানামা এবং গন্তব্য দেশের নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় এক্সপোর্ট সেবা ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরামর্শ প্রদান করে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রপ্তানি তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়বে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক নীতির পরিবর্তন সম্পর্কে রিয়েল-টাইম আপডেট প্রদান করে বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সংস্থার কাজের প্রভাব শুধু রপ্তানি সংখ্যায় নয়, বরং দেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন বাড়বে, ফলে শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে, রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ শক্তিশালী করবে।
সারসংক্ষেপে, এক্সপোর্ট সেবা রপ্তানি প্রক্রিয়ার জটিলতা সরলীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং ডিজিটাল সেবার সমন্বয়ে সংস্থা দেশের ছোট ও মাঝারি শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। ভবিষ্যতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পূর্ণাঙ্গ কার্যকরীতা এবং বৃহত্তর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে রপ্তানি কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা যায়।



