ময়মনসিংহের পারানগঞ্জ ইউনিয়নের টানহাসাদিয়া গ্রামে ২০০১ সালে রিকশা চালক জয়নাল আবেদিনের উদ্যোগে একটি ছোট হাসপাতাল চালু হয়। তিনি নিজের রিকশা প্যাডেল ঘুরিয়ে সঞ্চিত আয় থেকে ২৪ শতাংশ জমি কিনে, মেয়ে মমতাজের নামে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন।
জয়নাল আবেদিনের জীবনের মোড় বদলে দেয় বাবা হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনা। চিকিৎসা সেবা না পেয়ে যে কষ্ট ভোগ করেন, তা দেখে তিনি গ্রামে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ার স্বপ্ন দেখেন। রিকশা চালিয়ে গড়ে তোলা ৪০ হাজার টাকার মাসিক আয়ই তার স্বপ্নের মূলধন হয়ে ওঠে।
টানহাসাদিয়া গ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যেখানে তখন কোনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ছিল না। জয়নাল গ্রামবাসীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা, মৌলিক ওষুধ এবং ডায়াবেটিস পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে প্যাডেল চালিয়ে হাসপাতালের দৈনন্দিন কাজকর্ম তদারকি করতেন।
হাসপাতালের প্রাথমিক সেবা মূলত ১০ টাকার টিকিটের মাধ্যমে প্রদান করা হতো, যার মধ্যে ডাক্তারের পরামর্শ এবং মৌলিক ওষুধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতি মাসে হাসপাতালের মোট ব্যয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, যা মূলত রিকশা চালনার আয় থেকে সরবরাহ করা হতো।
২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি জয়নাল আবেদিন বয়সজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণে মারা যান। তার মৃত্যুর পর হাসপাতালের পরিচালনা ঝুঁকিতে পড়ে, তবে পরিবার ও আত্মীয়দের সমর্থনে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়নি।
সুইডেনে বসবাসকারী জয়হিদ হাসান, জয়নালের একমাত্র পুত্র, বিদেশ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা এনে হাসপাতালের কাজ চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেন। জয়হিদের পাশাপাশি জয়নালের ভাতিজা আশিক মিয়া দৈনন্দিন পরিচালনা তত্ত্বাবধান করেন।
আশিক মিয়া জানান, জয়নাল গ্রামবাসীর চোখে “সাদা মন” হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তার মৃত্যুর পর কোনো সরকারি অনুদান বা দান না পেয়ে পরিবারই একমাত্র আর্থিক সমর্থন। চাচাতো ভাইয়ের স্বেচ্ছা অর্থায়নে হাসপাতালটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে তিন দিন—শনিবার, সোমবার ও বুধবার—সেবা প্রদান করা হতো, তবে গত বছর ১ নভেম্বর থেকে সেবা সময়সূচি পরিবর্তন করে শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত পাঁচ দিন চালু করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে রোগীর সংখ্যা বাড়ে, প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী সেবা পান।
হাসপাতালের সেবা কাঠামো এখনও মূলত মৌলিক চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ এবং ডায়াবেটিস স্ক্রিনিংয়ে কেন্দ্রীভূত। রোগীরা ১০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ডাক্তারের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতে পারেন, আর অতিরিক্ত কোনো চার্জ না দিয়ে মৌলিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
আশিক মিয়া উল্লেখ করেন, হাসপাতালের মাসিক ব্যয় ৫০-৬০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে তিনি এবং তার পরিবার অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। যদিও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে মানবিক সেবার উদ্দেশ্যে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
টানহাসাদিয়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে এই হাসপাতালটি স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। বিনামূল্যের সেবা ও সাশ্রয়ী টিকিটের মাধ্যমে গ্রামবাসীর মৌলিক স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের জন্য এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ছে। ভবিষ্যতে সরকারী স্বাস্থ্য নীতি ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমন্বয় কীভাবে গ্রাম্য স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।



