বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ পরিমাণে সামান্য হ্রাস দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১০.১৩১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষে ৯.৭৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ১১ মাসের মধ্যে ঋণ প্রায় ৩.৩৫ শতাংশ কমেছে।
বৈদেশিক ঋণের গঠনেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ৯.৫৪৯ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা সেপ্টেম্বরের শেষে ৯.৬১৭ বিলিয়ন ডলার, অক্টোবরের শেষে ৯.৭১৭ বিলিয়ন ডলার এবং নভেম্বরের শেষে ৯.৭৯২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মাসিক ভিত্তিতে ঋণ সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে বছরের তুলনায় মোট ঋণ হ্রাস স্পষ্ট।
বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের বৃদ্ধিও ধীর হয়েছে। একই সময়ে, ব্যাংক ঋণের বৃদ্ধির হার ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে আটকে রয়েছে এবং নভেম্বরের শেষে তা ৬.৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এই সংখ্যা পূর্বের উচ্চ বৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিতকারী মূল কারণগুলোও স্পষ্ট। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা, জ্বালানিসংকট এবং উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের চাহিদা কমে গেছে, এবং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের বেশিরভাগই নতুন প্রকল্পের জন্য নয়, বরং আমদানি বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পুরনো দায় মেটাতে ব্যবহার হচ্ছে। এই ধারা অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের প্রবাহকে বাধা দেয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন বিনিয়োগের অভাবে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, সীমিত শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ সরাসরি কর্মসংস্থান ও জিডিপি বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। বিনিয়োগ কমলে বেকারত্ব বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি শ্লথ হবে।
বেসরকারি খাতে ঋণ হ্রাসের পরেও, ঋণ ব্যবহারিক দিক থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারছে না। আমদানি-নির্ভর খরচের বৃদ্ধি এবং জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা ব্যবসায়িক খরচকে বাড়িয়ে তুলেছে, যা লাভের মার্জিনকে সংকুচিত করছে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধে মনোযোগ দিচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি আর্থিক সংস্থাগুলোর জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ঋণ পোর্টফোলিওতে অধিকাংশই স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যা পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে, ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক স্বাস্থ্যের অবনতি ব্যাংকগুলোর নন-পারফরমিং ঋণ (এনপিএল) বাড়াতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, ঋণ হ্রাসের পরেও বিনিয়োগের গতি ধীর থাকলে শেয়ারবাজারে বেসরকারি খাতের স্টকগুলোতে চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি আমদানি-নির্ভর, তাদের মুনাফা মার্জিন হ্রাস পাবে এবং শেয়ার মূল্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। উচ্চ সুদের হার কমাতে, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করতে এবং আইন-শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে পদক্ষেপ নিলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে। তদুপরি, ঋণ ব্যবহারের কাঠামো পরিবর্তন করে উৎপাদনশীল প্রকল্পে উৎসাহিত করা দরকার।
সংক্ষেপে, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ হ্রাসের পরেও ঋণ ব্যবহারিক দিক থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে, এবং ব্যাংক ঋণের বৃদ্ধিও ধীর গতি বজায় রেখেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং জ্বালানি সংকটের সমন্বয় নতুন বিনিয়োগকে কঠিন করে তুলেছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে কর্মসংস্থান, জিডিপি এবং শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব বাড়তে পারে।
ভবিষ্যতে, যদি সরকার বিনিয়োগ-সহায়ক নীতি চালু করে, সুদের হার কমায় এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণ ব্যবহারিক দিক থেকে উৎপাদনশীল প্রকল্পে রূপান্তরিত হতে পারে। তা না হলে, ঋণ হ্রাসের পরেও অর্থনৈতিক গতি শ্লথ হয়ে থাকবে এবং বেকারত্বের হার বাড়তে পারে।



