ঢাকা – বাংলাদেশে ডিসেম্বর মাসে অর্থনৈতিক গতি পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা দেশের ক্রয় ব্যবস্থাপক সূচক (PMI) থেকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (MCCI) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (PEB) একত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, ডিসেম্বরের PMI ৫৪.২ এ পৌঁছেছে, যা পূর্ব মাসের ৫৪ থেকে ০.২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
PMI একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পূর্বাভাসমূলক সূচক, যা উৎপাদন, সেবা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের কার্যক্রমের সামগ্রিক দিক নির্দেশ করে। সূচকের মান ৫০‑এর উপরে থাকলে অর্থনীতি সম্প্রসারণের পথে থাকে, আর ৫০‑এর নিচে হলে সংকোচনের সংকেত দেয়। ডিসেম্বরের ৫৪.২ মানটি স্পষ্টভাবে সম্প্রসারণের দিক নির্দেশ করে, যদিও বৃদ্ধি সূক্ষ্ম মাত্রার।
অক্টোবর মাসে PMI ৬১.৮ এ পৌঁছেছিল, যা পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ ছিল। তবে অক্টোবরের পর থেকে সূচকটি ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে ডিসেম্বরের বর্তমান স্তরে নেমে এসেছে। এই প্রবণতা নির্দেশ করে যে, অর্থনৈতিক গতি কিছুটা ধীর হলেও এখনও সম্প্রসারণের সীমার মধ্যে রয়েছে।
সেক্টরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি খাত ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণের ধার বজায় রেখেছে এবং এই মাসে তার চতুর্থ ধারাবাহিক মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষি পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়ার ফলে এই সেক্টরটি সামগ্রিক সূচকে প্রধান অবদান রেখেছে।
উৎপাদন ও সেবা খাতেও সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যদিও তাদের বৃদ্ধির হার কৃষি খাতের তুলনায় কম। শিল্প উৎপাদনে কিছুটা স্থবিরতা দেখা গেলেও, সেবা খাতে গ্রাহক চাহিদা এবং ডিজিটাল সেবার প্রসার সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
PEB-র চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক PMI ফলাফলগুলো অর্থনীতির সামান্য সম্প্রসারণকে নির্দেশ করে, যার মূল চালিকাশক্তি শক্তিশালী কৃষি সেক্টরের পারফরম্যান্স। এই মন্তব্যটি সূচকের সামগ্রিক প্রবণতা ও সেক্টরীয় অবদানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারের চাহিদা হ্রাসের পরও বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের রপ্তানি স্থিতিশীল থাকা, স্থানীয় বাজারে চাহিদা বজায় রাখা এবং মৌসুমী উৎপাদনের উন্নতি এই সূচকের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের এই সূক্ষ্ম বৃদ্ধি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করে। উৎপাদন খাতে নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা, কৃষি ভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ এবং সেবা খাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার সম্ভাব্যভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।
তবে, আন্তর্জাতিক পণ্য মূল্যের ওঠানামা, মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা এবং বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা কৃষি উৎপাদনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়কে বিবেচনা করে নীতিনির্ধারকদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক গতি স্থিতিশীল থাকে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি কৃষি খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প ও সেবা খাতের কাঠামোগত সংস্কার চালু থাকে, তবে আগামী ত্রৈমাসিকে PMI ৫৫‑এর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনীতির ত্বরান্বিত গতি নির্দেশ করবে।
সারসংক্ষেপে, ডিসেম্বরের PMI সূচক দেখায় যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের পথে অগ্রসর, যদিও গতি ধীর। কৃষি সেক্টরের শক্তিশালী পারফরম্যান্স এই প্রবণতাকে সমর্থন করছে, এবং উৎপাদন ও সেবা খাতের পুনরুজ্জীবন ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। নীতি নির্ধারক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে এই সূক্ষ্ম সম্প্রসারণকে শক্তিশালী করার জন্য কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণে মনোযোগ দিতে হবে।



