বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বর্তমানে বহু সংস্থা স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার ফলে নীতি সংঘাত ও অদক্ষতার মুখোমুখি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বি.আই.ডি.এ., সিকিউরিটিজ কমিশন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যেকের নিজস্ব দায়িত্ব ও অগ্রাধিকার রয়েছে, যা একত্রে সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করে।
১৯৬১ সালে দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করে, যা পরিকল্পনা, বাজেট, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণকে রাষ্ট্রপতির অধীনে একত্রিত করে। একই বছর সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে, যাতে বিনিয়োগকারী, অবকাঠামো, দক্ষতা ও বাণিজ্যকে একক শিল্প দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্য করা যায়। এই সংস্থাগুলি ব্যুরোক্রেসি বাড়ানোর জন্য নয়, বরং সীমিত সম্পদে দেশকে স্পষ্টতা ও শৃঙ্খলা দিয়ে এগিয়ে নিতে সমন্বয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশকে এই মডেলগুলো ঠিক অনুলিপি করতে হবে না, তবে সমন্বয়ের গুরুত্ব থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক নীতি গঠন প্রধানত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বি.আই.ডি.এ., সিকিউরিটিজ কমিশন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়, তবে এদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। ফলে কর, বিনিয়োগ, মুদ্রা, বাণিজ্য ও শিল্প নীতি প্রায়শই আলাদা আলাদা ভাবে গৃহীত হয় এবং বাস্তব অর্থনীতিতে পরস্পর বিরোধ সৃষ্টি করে।
এই বিচ্ছিন্নতার বাস্তব খরচ স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, নির্মাণ সামগ্রীর উপর কর নীতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড স্বল্পমেয়াদী রাজস্ব লক্ষ্য রক্ষার জন্য সিমেন্টে ভ্যাট ও অন্যান্য কর বজায় রাখতে পারে, যদিও সিমেন্টের ইটের কর কমালে তা পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট ইটকে প্রচলিত জ্বালানি ইটের তুলনায় সাশ্রয়ী করে তুলতে পারে। ফলে বায়ু দূষণ কমে, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হয় এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়ে।
এখানে দেখা যায় যে করের সিদ্ধান্ত কেবল আর্থিক বিষয় নয়, এটি শিল্প, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নির্মাণ খাত একা প্রায় ৩,৬০০টি সংশ্লিষ্ট শিল্পকে স্পর্শ করে, যার মধ্যে ইস্পাত উৎপাদন থেকে শুরু করে মাইক্রোফাইন্যান্স পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত। তাই কোনো একক নীতি পরিবর্তন পুরো অর্থনীতিতে বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে।
সমন্বিত নীতি গঠনের অভাবের ফলে নীতি সংঘাত বাড়ে, সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার হয় এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ হারায়। একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় সংস্থা গঠন করলে আর্থিক, মুদ্রা, বাণিজ্য ও শিল্প নীতি একসাথে পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে, যা নীতি সংঘাত কমিয়ে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
এধরনের সমন্বয় কেন্দ্রের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে, বিভিন্ন সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি একত্রিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্য স্পষ্ট হবে। ফলে বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে একটি একক অর্থনৈতিক সমন্বয় কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এই কেন্দ্র পরিকল্পনা, বাজেট এবং বিশ্লেষণকে একত্রে নিয়ে কাজ করবে, যা দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের সফল মডেল থেকে শিখে দেশের অর্থনৈতিক নীতি গঠনে শৃঙ্খলা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।



