মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত তেল-গ্যাস শিল্পীর সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি সেক্রেটারি ক্রিস রাইটের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার নিষেধাজ্ঞা সাপেক্ষে তেল বিক্রয় অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে। রাইট উল্লেখ করেন, বিক্রয় শুরু হবে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দিয়ে এবং বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত আয় সম্পূর্ণভাবে মার্কিন সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে, যাতে ভেনেজুয়েলার সরকারে প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখা যায়।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হল তেল প্রবাহকে স্বাভাবিক করা এবং একইসাথে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় লিভারেজ তৈরি করা। রাইটের মতে, বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থের কিছু অংশ ভেনেজুয়েলায় ফিরে যাবে, তবে সুনির্দিষ্ট ভাগের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই বিক্রয় থেকে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে।
প্রেস কনফারেন্সে রাইটের আরেকটি মন্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “আমরা তেলকে প্রবাহিত হতে দেব,” যা যুক্তরাষ্ট্রের তেল নীতি পরিবর্তনের সংকেত দেয়। একই সময়ে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক মিডিয়া পোস্টে উল্লেখ করা হয় যে, ভেনেজুয়েলা সর্বোচ্চ ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তান্তর করবে, যা বাজার মূল্যে বিক্রি হবে এবং অর্জিত অর্থের ব্যবহার ভেনেজুয়েলার জনগণ ও যুক্তরাষ্ট্রের উভয়ের মঙ্গলে হবে।
ভেনেজুয়েলার তেল সংরক্ষণ বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ, তবে দীর্ঘমেয়াদী আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব এবং ব্যবস্থাপনা ত্রুটির ফলে উৎপাদন মাত্র প্রায় এক মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ১% এর কম। পূর্বে এই তেল প্রধানত চীনের কাছে রপ্তানি হতো, তবে সাম্প্রতিক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর আক্রমণ ও অবরোধের ফলে চীনের সরবরাহেও বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।
চীন সরকারও এই পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মাদুরোকে গ্রেপ্তার এবং ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনাকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই নীতি পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বিক্রয়ের সময়সূচি ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির উপর। তেল বিক্রয়ের পরিমাণ ও আয়ের ভাগের স্পষ্টতা না থাকায় বাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল বাজারে পুনরায় প্রবেশের মাধ্যমে গ্লোবাল তেল মূল্যে সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হচ্ছে।
অধিকন্তু, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুক্রবার হোয়াইট হাউসে তেল শিল্পের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে একটি বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে বিক্রয়ের বিস্তারিত শর্তাবলী ও তহবিলের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে। এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের তেল নীতি ও ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে তার শাসনের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। মাদুরোর সরকার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের তেল নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন খোঁজার চেষ্টা করেছিল, তবে এখনো কোনো সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গঠন করা যায়নি।
এই বিক্রয় পরিকল্পনা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে তাত্ক্ষণিক আর্থিক প্রবাহ আনতে পারে, তবে একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের তেল বাজারে প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নীতিকে ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের একটি কৌশল হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রয় অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে, বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত আয় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এই ব্যবস্থা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য লিভারেজ হিসেবে কাজ করবে। এই নীতি গ্লোবাল তেল বাজার, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



