কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বেইজিংয়ে ভ্রমণ করবেন, যা প্রায় দশ বছর পর কানাডার শীর্ষ রাষ্ট্রনেতার প্রথম চীন সফর। তিনি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃষি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা করবেন। সফরের পটভূমি হল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি থেকে দূরে সরে কানাডার অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর প্রচেষ্টা। সফরের সময় তিনি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করবেন।
কার্নি অক্টোবর মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় শীর্ষ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। এই সাক্ষাৎকারের পর চীনের সরকার দ্রুত কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এই সফরকে কানাডা-চীন সম্পর্কের পুনর্নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ দুই দেশের মধ্যে ২০২৪ সাল থেকে বাণিজ্য বিরোধ চলমান।
২০২৪ অক্টোবর মাসে কানাডা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০% শুল্ক আরোপ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ পদক্ষেপের প্রতিফলন। একই মাসে চীনা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ২৫% শুল্কও ধার্য করা হয়। এই নীতিগুলি চীন-কানাডা বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
চীন ২০২৩ সালের মার্চে কানাডার কয়েকটি কৃষি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, যার মধ্যে ক্যানোলা বীজের ওপর ৭৬% এবং ক্যানোলা তেল, ময়দা ও মটরশুটির ওপর ১০০% শুল্ক অন্তর্ভুক্ত। কানাডার পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা এই শুল্কের ফলে বড় ক্ষতির সম্মুখীন, কারণ চীন ক্যানোলা বীজের প্রধান ক্রেতা।
কার্নি সফরের সময় চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে “একটি পরিবর্তনের মুহূর্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং উভয় দেশকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে জোর দেন। তিনি বলেন, দূরত্ব সমস্যার সমাধান নয়, জনগণের সেবা করার উপায়ও নয়।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে, কানাডার শুল্ক নীতি তার রপ্তানি বাজারকে সংকুচিত করেছে, তাই চীনও কানাডার কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের মতে, উভয় দেশের মধ্যে সমতা বজায় রেখে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা উভয়ের স্বার্থে।
কানাডা-চীন সম্পর্কের এই নতুন মোড়ের ফলে কানাডা তার অ-যুক্তরাষ্ট্রীয় রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ি শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব কমাতে চীন থেকে বিকল্প বাজার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কানাডা সরকার এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নতুন বাণিজ্যিক মিশন গঠন এবং চীনা বাজারে প্রবেশের জন্য বিশেষ নীতি তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক আলোচনা এখনও স্থগিত রয়েছে, এবং দীর্ঘস্থায়ী ফ্রি ট্রেড চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলমান। এই প্রেক্ষাপটে চীন-সফর কানাডার জন্য একটি বিকল্প কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে তা সফল হবে কিনা তা পরবর্তী আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
আগামী সপ্তাহে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে শুল্ক হ্রাস, কৃষি পণ্যের রপ্তানি শর্তাবলী এবং জ্বালানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে আলোচনা চালাবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি এই সফর সফল হয়, তবে কানাডা-চীন বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন উভয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতিশক্তি যোগ করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে। তবে শুল্ক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে পারস্পরিক সমঝোতা না হলে পুনরায় উত্তেজনা বাড়তে পারে।



