ঢাকা, ৭ জানুয়ারি – সরকার লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারী শেয়ারধারী বহুজাতিক সংস্থাগুলোর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি অনুমোদনের নীতিগত স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে দশটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি শেয়ারবাজারে আসবে।
নীতিগত অনুমোদন পূর্বে বহুবার আলোচনার বিষয় ছিল, তবে এবার মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেছে। সরকারী শেয়ারধারী সংস্থাগুলোর তালিকাভুক্তি বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য রাখে।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এর চেয়ারম্যান আবু আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার সূচনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ করা ছিল।
প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত দশটি সংস্থা হল: কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস, সিনজেনটা বাংলাদেশ, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, সিনোভিয়া বাংলাদেশ, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) এবং নেসলে বাংলাদেশ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা হলে মোট শেয়ার মূলধনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বৈঠকে বাণিজ্য উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ‑জ্বালানি‑খনিজসম্পদ উপদেষ্টা, শিল্প উপদেষ্টা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। সকল অংশগ্রহণকারী তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার দ্রুততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অর্থ উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, শেয়ারবাজার বর্তমানে আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থিতিশীল, তবে বাজারের গভীরতা ও তরলতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারী শেয়ারধারী সংস্থাগুলোর শেয়ারবাজারে প্রবেশকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকারি সংস্থাগুলোর তালিকাভুক্তি বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শক্তি, গ্যাস ও ফার্টিলাইজার সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই তাদের শেয়ারবাজারে উপস্থিতি বাজারের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করবে।
বহুজাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে সরকার শেয়ারধারী হলেও তারা বর্তমানে তালিকাভুক্ত নয়। উপদেষ্টা জানান, তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া শীঘ্রই শুরু হবে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল। সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সম্মতি প্রদান করেছে।
প্রক্রিয়া শুরু হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে শেয়ার ইস্যু, রেজিস্ট্রেশন ও প্রাইসিং সংক্রান্ত নিয়মাবলী মেনে চলতে হবে। আইসিবি ও বিএসইসি সমন্বয়ে তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রথম ত্রৈমাসিকে এই দশটি সংস্থার শেয়ারবাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, তালিকাভুক্তি ফলে শেয়ারবাজারের মোট মূলধন বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ আকৃষ্ট হবে। বিশেষ করে গ্যাস ও শক্তি সেক্টরের শেয়ারগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, যা রপ্তানি ও বাণিজ্যিক লেনদেনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে দ্রুত তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে কিছু ঝুঁকি যুক্ত। শেয়ারবাজারে নতুন সংস্থার প্রবেশে মূল্য অস্থিরতা, লিকুইডিটি সমস্যার সম্ভাবনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার রক্ষার জন্য যথাযথ শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধান গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সংক্ষেপে, সরকারী শেয়ারধারী সংস্থাগুলোর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি দেশের পুঁজি বাজারকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। প্রক্রিয়ার দ্রুততা, স্বচ্ছতা এবং শাসনব্যবস্থার দৃঢ়তা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি সম্ভব হবে।



