ঢাকা, ৭ জানুয়ারি – ড্রিক ফাউন্ডেশন ও আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ার হলের মঞ্চে রিফিউজি এন্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (RAMRU) আয়োজিত অভিবাসন খাতের গতি‑প্রকৃতি বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী ভোটের বিষয়কে কেন্দ্র করে তার হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রবাসীদের ভোটিং প্রক্রিয়া দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে বর্তমান সময়ে তা পোস্টাল ব্যালটে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া তার কাজের ফলাফলকে নষ্ট করেছে।
আলম বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে অনলাইন ভোটিং বা অ্যাপ‑ভিত্তিক সিস্টেমের কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না। তিনি যুক্তি দেন, অন্য দেশে যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভোটিং সহজ করা হয়েছে, আমাদের দেশে স্বার্থের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই স্বার্থের পেছনে কারা আছে তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
মতামত প্রকাশের পাশাপাশি আলম প্রবাসীদের প্রতি দেশের আচরণকে সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনে প্রবাসীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয় তা থেকে স্পষ্ট হয় তারা কীভাবে দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বলেন, প্রবাসীরা ত্যাগের ভিত্তিতে বিদেশে গিয়ে দেশের জন্য আর্থিক সহায়তা পাঠায়, তবে সেই অর্থের উৎস ও সংগ্রহের কষ্টকে সরকার প্রায়ই উপেক্ষা করে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলম ব্যাখ্যা করেন, ব্যবসায়িক ভাষায় এটি রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টের মত, যেখানে বিনিয়োগ না করেও টাকা প্রবাহিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, এই অর্থের বেশিরভাগই কিছু লোকের হাতে গিয়ে বড় বড় বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার হয়, যা দেশের উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি নয়।
প্রবাসীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও আলমের বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি জানিয়েছেন, প্রতি বছর প্রায় তিন থেকে চার হাজার প্রবাসীর দেহ বাংলাদেশে ফিরে আসে। এই ব্যক্তিরা স্বপ্ন ও ত্যাগের সঙ্গে বিদেশে গিয়ে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা পাঠাত। তবে মৃত্যুর পর তাদের কবরস্থানের খরচ বহন করা অনেক পরিবারই সামলাতে পারে না, যা সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন তুলেছে।
দূতাবাসের কার্যক্রম সম্পর্কেও আলমের তীব্র সমালোচনা শোনা যায়। তিনি বলেন, প্রতিটি দূতাবাসে দুর্নীতির একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে দালালরা টাকা গ্রহণ করে লেনদেন সম্পন্ন করে। দূতাবাসের ভিতরে এই ধরনের লেনদেনের কোনো স্বচ্ছ পথ না থাকায় এটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মন্তব্যগুলো RAMRU-র অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা ও নীতি প্রস্তাবের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। সম্মেলনে উপস্থিত অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা প্রবাসী ভোটের সঠিক প্রয়োগ, ডিজিটাল ভোটিং সিস্টেমের সম্ভাবনা এবং দূতাবাসের স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।
শহিদুল আলমের বক্তব্যের ভিত্তিতে সরকারী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি কীভাবে পদক্ষেপ নেবে তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে তিনি স্পষ্ট করে বলছেন, প্রবাসী ভোটের সঠিক বাস্তবায়ন না হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আর্থিক স্বচ্ছতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যতে পোস্টাল ব্যালটের পরিবর্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটিং নিশ্চিত করা, দূতাবাসের দুর্নীতি নির্মূল করা এবং প্রবাসী মৃত্যুর পর কবরস্থানের ব্যবস্থা সহজ করা এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে RAMRU সরকারকে প্রবাসী ভোটের আইনি কাঠামো পুনর্বিবেচনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং দূতাবাসের তদারকি শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়। শহিদুল আলমের মতামত ও বিশ্লেষণ এই প্রক্রিয়ার পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যা দেশের গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



