চট্টগ্রামের বোয়ালখালিতে ৭ বছর বয়সী মোস্তফা রোহান নামের একটি শিশুর খতনা-শল্যকালের সময় চিকিৎসা সংক্রান্ত ত্রুটির ফলে মৃত্যু হয়েছে। শনিবার, ৩ জানুয়ারি, শিশুর শল্যচিকিৎসা প্রস্তুতির সময় শারীরিক অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) এ স্থানান্তরিত হওয়ার পর রাতেই তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়। ঘটনাটি মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
শিশুটির পূর্বে ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৪-এ একই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে গ্ল্যানুলার হাইপোস্প্যাডিয়াস নামে পরিচিত একটি জন্মগত মূত্রনালীর ত্রুটি নির্ণয় করা হয়। ঐ সময়ের চিকিৎসা নথিতে উল্লেখ করা হয় যে শিশুর জন্য খতনা এবং ছোট ধরনের শল্যচিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এতে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হবে।
মোস্তফার বাবা আবু মুসা জানান, শিশুটি শল্যচিকিৎসা কক্ষে শুয়ে থাকা অবস্থায় হাসিখুশি ছিল এবং হঠাৎ করে ক্ষুধার কথা জানিয়ে তার খাবার না দেওয়ার পরামর্শ অনুসরণ করা হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, অ্যানেসথেসিয়ার ত্রুটিই মৃত্যুর মূল কারণ।
মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং চিকিৎসকের মারাত্মক অবহেলা ও ভুল প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যার মতো ঘটনার অংশ হতে পারে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর খতনা-শল্যকালে সাধারণত স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং জটিলতার সম্ভাবনা কম। গেনারেল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারে শ্বাসযন্ত্রের দমন, রক্তচাপের হ্রাস ইত্যাদি গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে ছোট বয়সের রোগীর ক্ষেত্রে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন উল্লেখ করেন, খতনা-শল্যকালে স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া সাধারণ পদ্ধতি এবং জটিলতা বিরল। তবে বর্তমান ঘটনার সঠিক কারণ নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তিনি তদন্তের ফলাফল প্রকাশের আগে কোনো অনুমান করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
ঘটনাটির পর স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্তের আদেশ জারি করে এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা চালু করে। একই সঙ্গে, পরিবারকে আইনি সহায়তা প্রদান এবং শোকের সময় মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য স্থানীয় সামাজিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।
শিশুর মৃত্যুর খবর সামাজিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ফলে জনমত গরম হয়ে উঠেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চিকিৎসা নিরাপত্তা, অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারের মানদণ্ড এবং শিশু শল্যচিকিৎসায় পিতামাতার সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে শিশু শল্যচিকিৎসার জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
অবশেষে, পরিবার এবং সমাজের জন্য এই ধরনের শোকজনক ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। পিতামাতা যখন কোনো শল্যচিকিৎসা পরিকল্পনা করেন, তখন অ্যানেসথেসিয়া পদ্ধতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় মতামত নেওয়া রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
শিশুর মৃত্যু একটি দুঃখজনক বাস্তবতা, তবে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। আপনি কি মনে করেন, শিশু শল্যচিকিৎসায় অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারের নিয়মাবলী কীভাবে উন্নত করা যায়?



