জুলাই ২০২২-এ ঢাকার রায়ের বাজারে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় গৃহযুদ্ধের শিকারের ১১৪ জন দেহকে বেওয়ারিশ হিসেবে সমাধি করা হয়। পুলিশ ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ (সিআইডি) এই দেহ থেকে DNA নমুনা সংগ্রহ করে পরিচয় নির্ণয়ের কাজ শুরু করে। ফলাফল আজ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পরপরই সরকার দেহগুলোকে গোপনীয়ভাবে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরবর্তীতে মানবাধিকার সংস্থার নজরে আসে। সিআইডি ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সীমায় DNA সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করে। এই কাজটি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সহায়তায় পরিচালিত হয়।
পরিবারগুলোকে স্বেচ্ছায় DNA নমুনা প্রদান করতে বলা হয়। এখন পর্যন্ত নয়টি পরিবারই নমুনা জমা দিয়েছে, যার মধ্যে আটজনের পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে। সিআইডি নিশ্চিত করেছে যে শনাক্ত শিকারেরা সবই বুলেটবিদ্ধ অবস্থায় নিহত।
শহীদদের নাম ও বয়স নিম্নরূপ: সোহেল রানা (৩৮), রফিকুল ইসলাম (৫২), আসাদুল্লাহ (৩২), মাহিন মিয়া (৩২), ফয়সাল সরকার (২৬), পারভেজ বেপারী (২৩), কাবিল হোসেন (৫৮) এবং রফিকুল ইসলাম (২৯)। এই তথ্যগুলো পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. মরিস টিডবাল বিনজ, যিনি মানবাধিকার ও মানবিক কাজের ক্ষেত্রে স্বীকৃত, সিআইডির কর্মীদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। তার অংশগ্রহণের ফলে প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।
সিআইডি পরিবারগুলোকে হটলাইন নম্বর ০১৩২০০১৯৯৯৯-এ যোগাযোগ করার আহ্বান জানায়, যাতে অতিরিক্ত DNA নমুনা জমা দিয়ে অনুপস্থিত শিকারের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। এই নম্বরটি বিশেষভাবে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের জন্য চালু করা হয়েছে।
প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সকল সংশ্লিষ্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনায় সরকার যে বর্বরতা চালিয়েছে তা ইতিহাসে বিরল। তিনি উল্লেখ করেন, নাগরিকদের হত্যা করে গৃহযুদ্ধের শিকারের সমাধি করা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনাতীত।
প্রফেসর ইউনূস আরও বলেন, সত্য উদ্ঘাটন এবং শহীদদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া নিখোঁজ পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় অগ্রগতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সত্যকে চিরদিন দমন করা সম্ভব নয়; শিকারের নাম ও পরিচয় অবশেষে প্রকাশ পাবে।
সরকারের পূর্বের বিবৃতি অনুযায়ী ঘটনাগুলোকে আইনগত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তবে পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তা অস্বীকার করে। DNA শনাক্তকরণ ফলাফল সরকারকে এই বিষয়ের পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র ফরেনসিক কাজ নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিকারের আত্মত্যাগ দেশের ইতিহাসে চিরস্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ হবে, এ কথা প্রফেসর ইউনূসের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে সিআইডি বাকি অনুপস্থিতদের জন্য অতিরিক্ত DNA সংগ্রহ চালিয়ে যাবে এবং ফলাফলকে জাতীয় স্তরে প্রকাশ করবে। সরকারকে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং পরিবারগুলোর চাহিদা মেটাতে আরও পদক্ষেপ নিতে বলা হচ্ছে।
এই DNA শনাক্তকরণ প্রকল্পের সফলতা রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধের শিকারের পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের আইনি দায়িত্ব নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।



