মার্কিন নৌবাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে ক্যারিবিয়ান সাগরে এমটি সোফিয়া নামের তেল ট্যাঙ্কারকে জব্দ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কমান্ডের মতে, জাহাজটি কোনো দেশের অধীনে না থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল এবং অবৈধ তেল পরিবহনে লিপ্ত ছিল।
এটি পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগরে রাশিয়ার পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার জব্দের পরের দ্বিতীয় পদক্ষেপ। উভয় ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডার্ক ফ্লিট’ নামে পরিচিত, ট্র্যাকিং সিস্টেমের বাইরে কাজ করা জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ কমান্ড জাহাজটিকে ‘রাষ্ট্রহীন’ ও ‘নিষেধাজ্ঞার অধীন’ বলে চিহ্নিত করেছে। তারা জাহাজের কার্যক্রমকে অবৈধ বলে দাবি করে, যদিও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সরাসরি কোনো সংযোগ প্রকাশ করা হয়নি।
ইউরোপীয় কমান্ডের উত্তর আটলান্টিকে ভেনেজুয়েলা-সংযুক্ত তেল ট্যাঙ্কার আটকের ঘোষণার পরই এই খবর প্রকাশিত হয়। আদালতের নথিতে ২০২৪ সালে ‘বেলা ১’ নামের ট্যাঙ্কারকে অবৈধ তেল পরিবহনের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
গত মাসে ভেনেজুয়েলা সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন কোস্ট গার্ড একটি ট্যাঙ্কার জব্দের চেষ্টা করলেও জাহাজটি পালিয়ে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পি-৮ নজরদারি বিমান, যুক্তরাজ্যের স্যাফোক বেস থেকে উড্ডয়ন করে, ট্যাঙ্কারটির গতিবিধি কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করে।
ট্যাঙ্কারের ক্রু জাহাজের গায়ে রাশিয়ার পতাকা তোলার মাধ্যমে আটক এড়ানোর চেষ্টা করে। রাশিয়ার সরকারি রেজিস্টারে জাহাজটি ‘মারিনেরা’ নামে নতুনভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
রাশিয়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রকে জাহাজটির পিছু নেওয়া বন্ধ করার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে জাহাজটি কোনো সার্বভৌম দেশের অধীনে নয়, তাই তাকে ‘রাষ্ট্রহীন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই অভিযানকে সমর্থন করতে যুক্তরাজ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। জানুয়ারির শুরুর দিকে ফেয়ারফোর্ড ও লেকেনহিথ বিমানঘাঁটিতে অন্তত বারোটি সি-১৭ পরিবহন বিমান, বেশ কিছু ভি-২২ ওএসপ্রি ও এ সি-১৩০ গনশিপ মোতায়েন করা হয়েছে।
মাদুরো সরকার এই পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর একটি অংশ হিসেবে দেখছে। ক্যারিবিয়ান সাগরে ট্যাঙ্কার জব্দের পর, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল বিবৃতি জোর দিয়ে বলেছে যে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা কোনো দেশই শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে না।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডার্ক ফ্লিট’ মোকাবিলার নীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্রতর হয়েছে এবং এটি বৈশ্বিক তেল বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তারা বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও জব্দের মাধ্যমে অবৈধ তেল প্রবাহ বন্ধ করা আন্তর্জাতিক শিপিং নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জব্দকৃত জাহাজের মালিকানা ও দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে জাহাজের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে দ্বিমত অব্যাহত থাকায় কূটনৈতিক আলোচনার তীব্রতা বাড়তে পারে।
ইউএন নিরাপত্তা পরিষদে এই ধরনের ‘ডার্ক ফ্লিট’ মোকাবিলার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বানও উঠেছে। যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, তবে ভবিষ্যতে অনধিকারিক তেল পরিবহনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, ক্যারিবিয়ান সাগরে এমটি সোফিয়া জব্দের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডার্ক ফ্লিট’ বিরোধী নীতি পুনরায় দৃঢ় হয়েছে। রাশিয়ার ফ্ল্যাগ তোলার পরও জাহাজকে রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা এবং সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ও তেল বাজারের গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।



