বাংলাদেশে স্বাস্থ্য‑সংক্রান্ত আলোচনার বেশিরভাগই হাসপাতাল, রোগের বিস্তার এবং মানবিক কষ্টের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকে। ডেঙ্গু মৌসুমের দীর্ঘায়িত হওয়া, শিশুরা যে দারিদ্র্যজনিত পুষ্টিকর ঘাটতি ভোগ করে এবং জলবায়ু‑প্রভাবিত রোগের নতুন জেলায় প্রবেশের খবরগুলো নিয়মিত শিরোনামে থাকে। তবে এই দৃশ্যমান সমস্যার পেছনে আরেকটি কম শোনা যায় এমন সংগ্রাম চলছে; যা রোগীর শয্যা নয়, বরং খামার, মাছের পুকুর, পাখি বাজার এবং মানুষের সঙ্গে প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সহাবস্থানের ঘরে শুরু হয়। এই ক্ষেত্রের কার্যক্রম সরাসরি আমাদের খাবারের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রোগ‑প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে ওষুধের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে।
এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পরিচালনা করে দেশের পশু চিকিৎসকরা, যাদের কাজের পরিধি কেবল গরু, মুরগি বা পোষা প্রাণীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। তারা মানব, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যের সংযোগস্থলে কাজ করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে “ওয়ান হেলথ” নামে পরিচিত। ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম ও শহরে মানুষ ও গৃহস্থ প্রাণীর ঘনিষ্ঠ মিথস্ক্রিয়া, পাশাপাশি জোনোসিস এবং বহুমাত্রিক ওষুধ‑প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি, এই পেশাকে জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কেন্দ্রে রাখে।
তবে বাস্তবে এই পেশার অবদান জনমত ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে প্রায় অদৃশ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পশু চিকিৎসকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত, তাদের কাজের চ্যালেঞ্জগুলো নীতিগত আলোচনায় কমই উঠে আসে। ফলে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা—যা রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা—সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করা যায়নি।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রথমে দেশের সংযুক্ত দুর্বলতাগুলো স্বীকার করা দরকার। মানুষ ও প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের কারণে রোগের বিস্তার সহজ, আর পরিবেশগত পরিবর্তন নতুন রোগজীবাণুকে উন্মুক্ত করে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অন্যান্য এশীয় দেশগুলো পশু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, একাধিক বিভাগীয় সমন্বয় ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করেছে। বাংলাদেশও এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিজের নীতি ও কাঠামোতে সংশোধন আনতে পারে।
সরকারি পশু চিকিৎসকের একটি সাধারণ কর্মদিবসের উদাহরণে দেখা যায়, সকালবেলা একটি মুরগির খামার থেকে হঠাৎ মৃত্যুর হার বাড়ার জরুরি কল আসে। ডাক্তার现场ে গিয়ে পাখিগুলো পরীক্ষা করেন, রোগনির্ণয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন এবং অবিলম্বে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন। এ ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ রোগের বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে, মাছের পুকুরে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে, বা পাখি বাজারে অস্বাভাবিক রোগের সংক্রমণ সন্দেহ হলে, পশু চিকিৎসকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
পশু চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের এই আন্তঃসংযোগের গুরুত্ব বোঝাতে সরকারকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন: প্রথমত, পশু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়িয়ে তাদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, একাধিক বিভাগ—স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ—মিলিয়ে একটি সমন্বিত নীতি গঠন করা; তৃতীয়ত, রোগের ত্বরিত সনাক্তকরণ ও নমুনা বিশ্লেষণের জন্য ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; এবং চতুর্থত, জনসাধারণের মধ্যে পশু‑মানব সংস্পর্শের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
এইসব ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে, দেশীয় রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যাবে, অ্যান্টিবায়োটিকের অযথা ব্যবহার হ্রাস পাবে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব কমে যাবে। তাই পশু চিকিৎসকদের কাজকে কেবল পশু স্বাস্থ্য নয়, সমগ্র জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
অবশেষে, পাঠকদের জন্য একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়া যায়: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রাণীর সঙ্গে যে সংস্পর্শ ঘটে, তা কি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য‑নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি হতে পারে।



