জুলাই ২০২৩-২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রায়ের বাজারে দাফন করা ১১৪ জনের দেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ (সিআইডি) সম্পন্ন করেছে। এই উদ্যোগটি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সহায়তায় পরিচালিত হয়। সংগ্রহের সময়সীমা ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
অপারেশন চলাকালীন সময়ে মোট নয়টি পরিবার স্বেচ্ছায় ডিএনএ নমুনা প্রদান করে। পরীক্ষার ফলাফল থেকে আটজন শহীদ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে বাকি একজনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। শনাক্ত শহীদদের মধ্যে রয়েছে সোহেল রানা (৩৮), রফিকুল ইসলাম (৫২), আসাদুল্লাহ (৩২), মাহিন মিয়া (৩২), ফয়সাল সরকার (২৬), পারভেজ বেপারী (২৩), কাবিল হোসেন (৫৮) এবং রফিকুল ইসলাম (২৯)। সিআইডি নিশ্চিত করেছে যে, এই সব শহীদই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিহত হয়েছেন।
ডিএনএ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ফরেনসিক বিজ্ঞানে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ ড. মরিস টিডবাল বিনজের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি মানবাধিকার ও মানবিক কাজের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ভাগ করে সিআইডির কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করেছেন।
ডিএনএ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সিআইডি হটলাইন ০১৩২০০১৯৯৯৯ চালু করেছে, যেখানে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রিয়জনের অবস্থান জানার জন্য আবেদন করতে পারেন। হটলাইনটি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় এবং তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে এই প্রতিবেদনের হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ঘটনার নিষ্ঠুরতা ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিশাল গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এমন নির্মম কাজের ইতিহাসে বিরলতা রয়েছে এবং কোনো সভ্য রাষ্ট্রে এ ধরনের গণকবরের কল্পনা করা কঠিন।
উপদেষ্টা আরও বলেন, শহীদদের পরিচয় পুনরুদ্ধার এবং সত্য উদ্ঘাটন নিখোঁজ পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরণের ফরেনসিক কাজ কেবল প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়, বরং শোকাহত পরিবারগুলোর মানসিক স্বস্তি ও দেশের নৈতিক দায়িত্বের প্রতিফলন।
ডিএনএ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনি বিভাগগুলোকে তথ্য প্রদান করা হবে, যাতে অপরাধের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়। বর্তমানে তদন্ত দলগুলো শহীদদের মৃত্যুর সময়কাল, গুলিবিদ্ধের স্থান এবং সম্ভাব্য দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্তকরণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অধিকন্তু, সরকারী সংস্থাগুলি এই ফলাফলকে ভিত্তি করে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে, ফরেনসিক ডিএনএ বিশ্লেষণ দেশের অপরাধমূলক তদন্তে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দরজা খুলে দেবে।
সর্বশেষে, সিআইডি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো শহীদদের নাম ও পরিচয় জনসাধারণের কাছে প্রকাশের মাধ্যমে ইতিহাসে তাদের অবদান স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই উদ্যোগটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার ও স্বস্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করবে।



