বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নতুন নির্দেশিকা জারি করে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন করেছে। এই পরিবর্তনটি ব্যাংকের নন‑পারফরমিং লোন (NPL) অনুপাতে নির্ধারিত, যা পূর্বে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা সীমা ছিল। নতুন নীতি অনুযায়ী, ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ কম থাকলে গৃহঋণের পরিমাণ বাড়বে, ফলে আবাসন সেক্টরে ঋণের চাহিদা ত্বরান্বিত হবে।
নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে, একটি ব্যাংকের একক গ্রাহককে সর্বোচ্চ কত টাকা গৃহঋণ দিতে পারবে তা তার মোট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণের শতাংশের ওপর নির্ভর করবে। যদি কোনো ব্যাংকের NPL ৫ শতাংশের নিচে থাকে, তবে সে ব্যাংক সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। NPL ৫‑১০ শতাংশের মধ্যে থাকলে ঋণের সীমা তিন কোটি টাকা, আর ১০ শতাংশের বেশি হলে পূর্বের দুই কোটি টাকা সীমা বজায় থাকবে।
ঋণ‑মূল্য অনুপাত (LTV) পূর্বের মতোই ৭০:৩০ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, গ্রাহক যদি ১০০ টাকা মূল্যের কোনো ফ্ল্যাট কিনতে চান, তবে ব্যাংক সর্বোচ্চ ৭০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেবে, বাকি ৩০ টাকা নিজের পুঁজি হিসেবে রাখতে হবে। এই অনুপাত সব ব্যাংকের জন্য একরূপ, যদিও ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ ব্যাংকের NPL স্তরের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, মোট সতেরটি ব্যাংকের NPL ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। এদের মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের NPL ৫ শতাংশের নিচে, যা সিটিজেন্স ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো নতুন নিয়মে সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ প্রদান করতে পারবে।
অন্যদিকে, NPL ৫‑১০ শতাংশের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলো মিডল্যান্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক এবং যমুনা ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ দিতে পারবে।
নির্দেশিকায় একটি উদাহরণও দেওয়া হয়েছে: যদি কোনো ফ্ল্যাটের মোট মূল্য পাঁচ কোটি একাত্তর লাখ টাকা হয়, তবে ৫ শতাংশের নিচে NPL থাকা ব্যাংক থেকে গ্রাহক সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা ঋণ নিতে পারবে। বাকি টাকা ৩০ শতাংশের নিজস্ব তহবিল হিসেবে রাখতে হবে, যা LTV অনুপাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই নীতিগত পরিবর্তন গৃহঋণের মোট পরিমাণ বাড়িয়ে আবাসন বাজারে তরলতা বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঋণের সীমা বাড়ার ফলে প্রথমবারের বাড়ি ক্রেতা ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য অর্থায়ন সহজ হবে, ফলে নতুন প্রকল্পের চাহিদা ও বিক্রয় উভয়ই ত্বরান্বিত হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, যদিও ঋণের পরিমাণ বাড়বে, তবে ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত ঋণের স্তর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য NPL সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। NPL কম থাকা ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ দিতে পারবে, যা তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শর্ত।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশিকা গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ঋণগ্রহীতাদের জন্য আর্থিক সুযোগ বৃদ্ধি করেছে, তবে ঋণ‑মূল্য অনুপাত ও NPL ভিত্তিক সীমা বজায় রেখে সিস্টেমিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের দিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। ভবিষ্যতে ঋণগ্রহীতার চাহিদা ও ব্যাংকের ঋণদানের সক্ষমতা এই নীতির বাস্তবায়ন ফলাফল নির্ধারণ করবে।



