ভারতীয় নৌবাহিনী ১২ জানুয়ারি রাত ২ টা থেকে ১৩ জানুয়ারি সকাল ৯ টা পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় “নোটিস টু এয়ার মিশন” (নোটাম) জারি করেছে। এই নোটামের আওতায় নির্ধারিত সময়ে উক্ত জোনে সকল বেসামরিক ও বিদেশি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লক্ষ্য হল সামরিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা রোধ করা।
নোটামটি বিশাখাপত্তনমের উপকূল থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের গভীর অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলসীমা। এই সময়সীমা নির্বাচিত হয়েছে কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট সামরিক কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা বিমান ও রাডার সিস্টেমের সমন্বয় প্রয়োজন।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই নোটামটি সম্ভবত নৌবাহিনীর কোনো নতুন মিসাইলের পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত। যদিও পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট ধরণ ও মডেল প্রকাশ করা হয়নি, তবে পূর্বের অনুরূপ কার্যক্রমের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে এটি দীর্ঘপরিসীমা কৌশলগত মিসাইল হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের কার্যক্রমের উদাহরণ দেখা গেছে। ২৯ ডিসেম্বর ওড়িশার চাঁদিপুর থেকে ভারতীয় পিনাকা দীর্ঘপরিসীমা মিসাইলের সফল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা একই জোনে পরিচালিত হয়েছিল। ঐ পরীক্ষায় ব্যবহৃত মিসাইলটি ক্যালম‑৪ সিরিজের অন্তর্ভুক্ত, যা পারমাণবিক বোমা বহন করার ক্ষমতা রাখে এবং প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত রেঞ্জ প্রদান করে।
ক্যালম‑৪ সিরিজের মিসাইলের এই রেঞ্জ অঞ্চলীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন এটি সমুদ্র থেকে লঞ্চ করা হয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, বঙ্গোপসাগর এখন ভারতের মিসাইল পরীক্ষার জন্য একটি প্রধান প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, যা ইন্ডো‑প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে।
এই নোটামের সময়সীমা সাম্প্রতিক কূটনৈতিক গতি-প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় মিসাইল ক্ষমতার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করছে এবং তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তান, যারা এই অঞ্চলে তাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, তারা এই ধরনের সামরিক কার্যক্রমকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করেন যে ৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা অঞ্চলটি লঞ্চ প্রস্তুতি, টেলিমেট্রি ট্র্যাকিং এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয়। এই সময়ে রাডার, স্যাটেলাইট এবং সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে, যাতে মিসাইলের পথ ও পারফরম্যান্স রিয়েল‑টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
“নোটিস টু এয়ার মিশন” একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়া, যা সামরিক প্রশিক্ষণ বা পরীক্ষার সময় বায়ু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে বেসামরিক বিমান চলাচলকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জোন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে কোনো অপ্রত্যাশিত সংঘর্ষ না ঘটে।
বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যিক নৌ-আকাশ চলাচলেও এই নোটাম প্রভাব ফেলবে। বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিমান সংস্থাগুলোকে বিকল্প রুট নির্ধারণ করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে ওই জোনে প্রবেশ নিষেধ হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা সামরিক কার্যক্রমের সময় বাণিজ্যিক ক্ষতি কমাতে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়ক।
ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো এই নোটামের পেছনের নির্দিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেনি। তবে পূর্বের পরীক্ষার ধারাবাহিকতা এবং সামরিক পরিকল্পনার স্বাভাবিকতা বিবেচনা করলে, এটি একটি পরিকল্পিত মিসাইল লঞ্চের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যায়।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন যে, ধারাবাহিক মিসাইল পরীক্ষা প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত গণনা পরিবর্তন করতে পারে। এটি সম্ভাব্যভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর নিজস্ব মিসাইল উন্নয়ন বা ডিপ্লয়মেন্টে ত্বরান্বিত করতে পারে, ফলে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন গতিবিদ্যা সৃষ্টি হবে।
এই নোটামের মাধ্যমে ভারত সমুদ্র থেকে লঞ্চযোগ্য দীর্ঘপরিসীমা মিসাইলের কার্যকারিতা যাচাই করতে চায়, যা তার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। সফল পরীক্ষা হলে, ভারতীয় নৌবাহিনী সমুদ্র থেকে কৌশলগত আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা অর্জন করবে, যা তার সামরিক নীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
নোটাম শেষ হওয়ার পর, ১৩ জানুয়ারি সকাল ৯ টা থেকে বিমান চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সময়ে নোটাম বাতিলের ঘোষণা করবে এবং বাণিজ্যিক ও বেসামরিক সেবা পুনরায় চালু হবে।
এই ঘটনাটি ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে প্রকাশ করে, যেখানে সমুদ্র-ভিত্তিক মিসাইল ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই ধরণের কার্যক্রমকে গ্লোবাল প্রতিরক্ষা প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে ইন্ডো‑প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।



