যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা পুনরায় প্রকাশের পর, ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো একত্রে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনা গড়ে তুলছে। ফ্রান্স, জার্মানি এবং পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে আজকের আলোচনায় এই বিষয়টি উত্থাপিত হবে, যেখানে ডেনমার্কের সঙ্গে সমন্বয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোত রেডিওতে জানিয়েছেন, ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে চাওয়া হচ্ছে, তবে তা একা নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে ইউরোপের সম্মতি প্রয়োজন।
একজন জার্মান সরকারি সূত্রের মতে, জার্মানি ডেনমার্ক এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এই সমন্বয় প্রক্রিয়া ন্যাটো জোটের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা কমাতে এবং ট্রাম্পের দাবি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
কানাডা এবং ইউরোপের প্রধান দেশগুলো এই সপ্তাহে একত্রিত হয়ে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে তার জনগণের হাতে রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছে, দ্বীপটি কেবল একটি কৌশলগত সম্পদ নয়, বরং তার নিজস্ব জনগণের অধিকারও রক্ষা করা দরকার।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা প্রথমবার ২০১৯ সালে তার শাসনকালে প্রকাশ পায়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, এই আর্কটিক দ্বীপটি মার্কিন সামরিক কৌশলের জন্য অপরিহার্য এবং ডেনমার্ক যথাযথ সুরক্ষা প্রদান করছে না।
হোয়াইট হাউসের একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অর্জনের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন, যার মধ্যে সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপীয় নেতারা এই ধরনের কোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করে, কারণ তা ন্যাটো জোটের ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বারোত উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিকের সঙ্গে তার ফোনালাপের সময় নিশ্চিত করা হয়েছে যে সামরিক আক্রমণ এখনো কোনো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও (যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী) এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সেইসাথে, সাম্প্রতিক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার নেতা গ্রেফতার করার অপারেশন চালায়, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি গ্রিনল্যান্ডের ওপর একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা ন্যাটো জোটের মধ্যে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
ডেনমার্কের সরকার ইতিমধ্যে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপকে নিন্দা করে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, যেখানে কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকে স্বীকার করে, তবে তা ডেনমার্কের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতিতে করা উচিত বলে জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, ন্যাটো জোটের সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপকে জোটের সংহতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
পরবর্তী সপ্তাহে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সমন্বিত কৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে। এই বৈঠকের ফলাফল ন্যাটো জোটের সামগ্রিক নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি ইউরোপীয় দেশগুলোকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা দিক থেকে একত্রিত করেছে। ন্যাটো জোটের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি উভয়ই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে মূল বিষয় হয়ে থাকবে।



