ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ বিকেলে ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে মিছিলের আয়োজন করেছিল। মিছিলের মূল দাবি ছিল ২০০৯ সালে বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানী খাতুনের গুলিতে মৃত্যুর ১৫ বছর পূর্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। মিছিলটি বাড্ডার শাহজাদপুরে সমাবেশের পর বারিধারায় গিয়ে হাইকমিশনের সামনে অগ্রসর হতে চেয়েছিল, তবে পুলিশ ব্যারিকেড গড়ে মিছিলকে থামিয়ে দেয়।
বাড্ডা শাহজাদপুরে প্রায় একশো সদস্য ও সমর্থক একত্রিত হয়ে রেলপথের পাশে দাঁড়িয়ে মিছিলের সূচনা করে। অংশগ্রহণকারীরা রিকশা, সাইকেল ও পায়ে হেঁটে হাইকমিশনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে হাইকমিশনের নিকটবর্তী এলাকায় পুলিশ গাড়ি ও কনক্রিটের বাধা স্থাপন করে, যা মিছিলকে অগ্রসর হতে বাধা দেয়।
পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে পৌঁছাতে না পারায় এনসিপি নেতারা কুড়িলমুখী সড়কে থেমে স্লোগান ও বক্তব্য দিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যায়। “দিল্লি না ঢাকা—ঢাকা, ঢাকা”, “কাঁটাতারের ফেলানী—আমরা তোমায় ভুলিনি”, “ভারতীয় আগ্রাসন—রুখে দাও জনগণ” ইত্যাদি স্লোগান শোনা যায়। অংশগ্রহণকারীরা রিকশা ও সাইকেলে বসে, গলিতে দাঁড়িয়ে তাদের দাবি পুনরাবৃত্তি করে।
বাধা সত্ত্বেও এনসিপি নেতারা রিকশা থামিয়ে, মঞ্চ স্থাপন করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তারা বলেছে, হাইকমিশনের কাছে পৌঁছাতে না পারলেও তাদের প্রতিবাদ থেমে যাবে না এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার দাবি করবে। মিছিলের শেষে অংশগ্রহণকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশস্থান ত্যাগ করে।
এনসিপি-র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব মঞ্চে বলেন, “সীমান্তে শুধু ফেলানীকে ঝুলিয়ে রাখা হয়নি, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।” তিনি আরও যুক্তি দেন, ২০১১ সালের কুড়িগ্রাম সীমান্তে ঘটিত হত্যাকাণ্ডে ভারতের সহায়তায় আওয়ামী লীগের পূর্বে গণহত্যা চালানো হয়েছিল। আদিব বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের অতীত অপশাসনকে বিচার করা প্রয়োজন এবং ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করা উচিত।
ফেলানী খাতুনের মৃত্যু ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় সীমান্ত পারাপারের সময় ঘটেছিল। তার বাবা কাজের সন্ধানে ভারতের দিকে গিয়েছিলেন; মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে দেশে ফেরার পথে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে তিনি নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পাঁচ ঘণ্টা তার দেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকা দৃশ্য দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ফেলানীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল ছিল; তার বাবা কাজের জন্য ভারত গিয়েছিলেন এবং মেয়ের বিয়ে শেষ হয়ে দেশে ফিরে আসার সময়ই এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যরা পরবর্তীতে ভারতের আদালতে ন্যায়বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সহায়তা নেয়।
২০১৩ সালে ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানীর হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। তবে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ প্রথম ও দ্বিতীয়বার উভয়ই খালাস পান। ২০১৪ সালে পুনরায় বিচার হলেও একই ফলাফল রয়ে যায়, যা ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই মামলায় তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করে এবং ভিকটিমের পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। তারা উল্লেখ করেছে, সীমান্তে গুলিবিদ্ধ শিকারীর মৃত্যুর পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এনসিপি এই মিছিলকে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দলটি বলেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো বিদেশি শক্তি যদি দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তবে জনগণ কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। মিছিলের মাধ্যমে এনসিপি সরকারের নীতিমালা ও অতীতের অপশাসনের বিচার দাবি করে, যা দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
প্রতিবাদী দলটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আদালতে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পরিকল্পনা করেছে এবং সরকারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বিষয়টি তুলে ধরতে বলেছে। তারা আরও দাবি করে, হাইকমিশনের সামনে পৌঁছাতে না পারলেও তাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তি বজায় রাখবে না।



