মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা সরকারকে রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ কেটে দিতে দাবি করেছে, যদি দেশটি তেল উত্তোলন বাড়াতে চায়। এই দাবি হোয়াইট হাউসের একটি পরিকল্পনা থেকে উদ্ভূত, যা তিনজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবিসি নিউজ প্রকাশ করেছে।
হোয়াইট হাউসের মতে, ভেনেজুয়েলা তেল উৎপাদনে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে, আর অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করবে। পরিকল্পনাটি যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে তাদের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
শুক্রবার রাতের অপারেশনে মার্কিন কমান্ডো দল ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করেছে। এই পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলা সরকার তার সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা প্রত্যাশা করছে।
অভিযানের সময় মাদুরো ও ফ্লোরেসকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানানো হলেও, ভেনেজুয়েলীয় কর্তৃপক্ষ তাদের মুক্তি দাবি করে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান চাচ্ছে। অপহরণকে রাজনৈতিক চাপে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন ধারণা ভেনেজুয়েলা ও তার মিত্রদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর প্রবেশের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে পূর্বের প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সময় তেল সম্পদ জাতীয়করণ করা অবৈধ ছিল এবং এখন ভেনেজুয়েলা পুনরায় আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হতে পারে।
শ্যাভেজের সময়ে তেল শিল্পের জাতীয়করণকে ট্রাম্প ‘অন্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করে, তিনি বর্তমান সময়ে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনকে পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল ক্ষেত্রের প্রবেশাধিকার প্রদান করা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে।
ভেনেজুয়েলার নতুন প্রেসিডেন্টের মিত্র ও বিদেশী বিষয়ক মন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপকে অগ্রাহ্য করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে কোনো বিদেশি এজেন্ট ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না এবং দেশের স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকবে।
মাদুরো ও ফ্লোরেসের মুক্তি দাবি করা ভেনেজুয়েলার সরকার আন্তর্জাতিক আইনি ফোরামে এই বিষয়টি তুলে ধরবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলা তার তেল শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করে স্বতন্ত্র নীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই চূড়ান্ত দাবি ভেনেজুয়েলার সঙ্গে রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। যদি ভেনেজুয়েলা এই শর্ত মেনে না নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, যা তেল রপ্তানি ও আর্থিক লেনদেনে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বিদ্যমান জ্বালানি চুক্তিগুলো বজায় রাখার জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। ইরান ও কিউবারও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে জটিল করে তুলবে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে এই পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকায় শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক তেল বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর ইচ্ছা ও যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের মধ্যে সংঘাত ভবিষ্যতে নতুন কূটনৈতিক আলোচনার সূচনা করতে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে পারে, তবে বর্তমান অবস্থায় উভয় পক্ষের অবস্থান দৃঢ় এবং তীব্র বিরোধের সম্ভাবনা এখনও উঁচু। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার তেল নীতি ও বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।



