ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-নোয়েল ব্যারোট বুধবার (৭ জানুয়ারি) জানিয়ে দিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সম্ভাব্য হুমকির মুখে ফ্রান্স তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি জার্মানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই বিষয়টি আলোচনার কথা উল্লেখ করেন।
ফ্রান্সের এই ঘোষণা ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের প্রতিফলন, যেখানে গ্রিনল্যান্ডকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যারোটের মতে, ফ্রান্সের অংশীদার দেশগুলো একত্রে একটি যৌথ নীতি গড়ে তুলবে, যাতে কোনো একক শক্তি স্বেচ্ছায় দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে তা আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যে রোধ করা যায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের আপত্তি সত্ত্বেও গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্প কৌশলগত দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন এবং সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের কথাও উত্থাপন করেছেন।
ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি জার্মানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ট্রাম্পের মন্তব্যকে অগ্রাহ্যযোগ্য বলে উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামরিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বড় আকারের অপারেশনে গ্রেপ্তার করা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলা সীমান্তে প্রবেশ করে মাদুরোকে গ্রেফতার করে এবং পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিশাল তেল সংরক্ষণকে আমেরিকায় হস্তান্তরের ঘোষণা দেন।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই তেল বিক্রয়ের আয় যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করা হবে। তবে তেল বাজারে এই হস্তান্তরের সম্ভাব্য প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা সম্পদকে সরাসরি অন্য দেশে স্থানান্তর করা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি বহন করে।
গ্রিনল্যান্ড বিষয়টি এবং ভেনেজুয়েলা তেল সংক্রান্ত ট্রাম্পের পদক্ষেপ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পারমাণবিক মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো এখন ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করছে এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর এর প্রভাব নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
ফ্রান্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জার্মানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা হবে। এই সমন্বিত উদ্যোগে সম্ভাব্য কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক বিকল্পগুলো বিবেচনা করা হবে, যাতে কোনো একক দেশের স্বৈরাচারী পদক্ষেপকে রোধ করা যায়।
ভবিষ্যতে ফরাসি, জার্মান ও পোলিশ কূটনীতিকদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে একটি যৌথ অবস্থান গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ ধরনের সমন্বয় নীতি শুধুমাত্র গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আক্রমণাত্মক নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করবে।
সামগ্রিকভাবে, গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের সম্ভাবনা এবং ভেনেজুয়েলা তেল সংক্রান্ত ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন মোড় নির্দেশ করে। ফ্রান্সের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া, জার্মানি ও পোল্যান্ডের সমর্থনসহ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একত্রিত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।



