২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুনের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত দেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ঘটনা দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে। গুলির দায়ী হিসেবে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্য অমিয় ঘোষের নাম উঠে আসে।
ফেলানী, ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণকারী, তখনই তার পরিবার ভারতের কাজের সন্ধানে গিয়েছিল। তার বাবা নুরুল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম বলছেন, মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করে দেশে ফেরার পথে এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। পরিবারটি তখনো অল্পবয়সী, আট সন্তানসহ, আর ফেলানী ছিল তাদের বড় সন্তান।
ঘটনার পরপরই ফেলানীর দেহ কাঁটাতারের বেলায় ঝুলে থাকা দৃশ্য টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচারিত হয়, যা মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের দাবি তীব্র করে। তবে ১৪ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও কোনো চূড়ান্ত রায় পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিশেষ আদালতে মামলাটি শোনা শুরু হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়। এই রায়ের পরপরই মানবাধিকার সংস্থা ‘মাসুম’ ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার চায়, তবে পুনর্বিবেচনায়ও ঘোষকে মুক্তি দেওয়া হয়।
২০১৫ সালের ১৪ জুলাই, ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম উচ্চ আদালতে রিভিউ আবেদন দায়ের করেন। এরপর থেকে বহুবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও, মামলাটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। উচ্চ আদালতে মামলাটি ঝুলে থাকা অবস্থায় পরিবারটি দীর্ঘ সময়ের জন্য ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাবা নুরুল ইসলাম জানান, “আমি ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেই মেয়ের হত্যার মামলা দায়ের করেছি, তবে এখনো কোনো ফল পাইনি। যেই সরকারই আসুক, ফেলানীর বিচার আগে দেখতে চাই। বিচার দেখে মরতে চাই।” মা জাহানারা বেগমও একই রকম অনুভূতি প্রকাশ করেন, “১৪ বছর পার হলেও মেয়ের জন্য কোনো ন্যায়বিচার পাইনি, আমি এখনও আশায় আছি যে একদিন সঠিক রায় পাব।”
সরকারি সূত্র ও তদন্তকারী কর্মকর্তার মতে, গুলির সময় সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যর্থ হয়েছে। মামলায় প্রমাণের ভিত্তিতে অমিয় ঘোষের বেকসুর খালাসের কারণ হিসেবে প্রমাণের অপর্যাপ্ততা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি দিক থেকে, বিশেষ আদালতে গৃহীত রায়ের পর উচ্চ আদালতে রিভিউ আবেদন দাখিল করা হয়েছে, যা এখনও শোনার অপেক্ষায়। আদালত কয়েকবার তারিখ নির্ধারণের পরও কোনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি, ফলে মামলাটি দীর্ঘায়িত হয়েছে।
ফেলানীর পরিবার এখনো ভারতের উচ্চ আদালতে রায়ের অপেক্ষায়। তাদের দাবি হল, সীমান্তে ঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে যথাযথ শাস্তি দেওয়া হোক এবং পরিবারকে ন্যায়বিচারের স্বস্তি প্রদান করা হোক।
এই মামলাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যারা বলছে যে সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে উভয় দেশের কর্তৃপক্ষকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিএসএফের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুলির ব্যবহার ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ তদন্ত বা দায়িত্বশীলতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
ফেলানীর পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে আদালতে আবেদন করে আসছে, যাতে মামলাটি দ্রুত সমাধান হয়। তারা আশা করছেন, উচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রদান করবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
এই দীর্ঘমেয়াদী ন্যায়বিচার অনুসন্ধান দেশের সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পরিবারটি এখনও আশা করে, একদিন তাদের কষ্টের শেষ হবে এবং ফেলানীর স্মৃতি সঠিক রায়ের মাধ্যমে সন্মানিত হবে।



