২০১১ সালে ভারতের বঙ্গাইগাঁও অঞ্চলে ১৪‑বছরের মেয়ে ফেলানীকে গৃহহত্যা করা হয়। তার পিতা নুরুল ইসলাম, দারিদ্র্যের মাঝেও মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে ইটভাটা ও বাসাবাড়িতে কাজ করাতেন। কয়েক মাসের কাজের পর, ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয়ে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করেন।
ফেলানীর মৃত্যুর পর, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মামলাটিকে আন্তর্জাতিক নজরে তুলে ধরে। ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার বিএসএফের বিশেষ আদালতে, জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে, মামলাটির বিচার শুরু হয়। নুরুল ইসলাম ও তার মামা হানিফ আলী উভয়েই আদালতে সাক্ষ্য দেন।
সেই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর, আদালত অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। নুরুল ইসলাম রায়ের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে, পুনরায় বিচারের দাবি জানিয়ে আপিল করেন। ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি আবারও আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন।
২০১৫ সালের ২ জুলাই, একই আদালত আবার অমিয় ঘোষকে মুক্তি দেয়। দুইবারের খালাসের পর, নুরুল ইসলাম এবং ভারতীয় মানবাধিকার কর্মী কিরতি রায় মামলাটিকে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেন। তবে রিটের নিষ্পত্তি এখনও বিলম্বের শিকারে, কারণ আদালত বারবার তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছে।
বছরের পর বছর আদালতে ঘুরে বেড়েও ন্যায়বিচার না পেয়ে নুরুল ইসলাম ক্লান্ত ও হতাশ বোধ করছেন। তবুও তিনি আশার আলো নিভে যেতে দিচ্ছেন না। তিনি স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, “ফেলানীর হত্যার বিচার এখনও আটকে আছে, ১৫ বছর হয়ে গেল, কোনো রায় পাইনি। একজন বাবার জন্য এটা অতি কষ্টের। নতুন সরকার যেই দলই শাসন করুক, দয়া করে আমার মেয়ের হত্যার মামলাটি দ্রুত সমাধান করুন। অমিয় ঘোষের উপর মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা উচিত।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “সরকার পরিবর্তনের পরও মামলাটি এগোচ্ছে না, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাই না।” তার এই উদ্বেগের পেছনে আর্থিক সংকটের বাস্তবতা রয়েছে। নুরুল ইসলামের পাঁচটি সন্তান রয়েছে; বড় মেয়ে মালেকা খাতুন লালমনিরহাটের আদিতমারী কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন, দ্বিতীয় ছেলে জাহান উদ্দিন নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজে শিক্ষালাভ করছেন, মেয়ে কাজলি খাতুন ও ছেলে আক্কাস আলী এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর আরফান আলী বিজিবিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
পরিবারের শিক্ষার খরচ বহন করতে নুরুল ইসলাম কঠিন পরিস্থিতিতে আছেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে কলেজে পড়ছে, কিন্তু আমি সংসার চালাতে পারছি না, তাদের শিক্ষার ব্যয় কীভাবে পূরণ করব? সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, আমার সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করুন।”
ফেলানীর মায়ের জাহানারা বেগমও কাঁদতে কাঁদতে তার কষ্ট ভাগ করে নেন। তিনি বলছেন, “ভারতের কাঁটাতার মতো কঠিন সময়ে আমাদের সন্তানকে হারিয়েছি, কিন্তু আমরা আশা ছাড়ি না। ন্যায়বিচার না হলে আমাদের কষ্টের শেষ হয় না।”
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে, বিএসএফের বিশেষ আদালত এখনও কোনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি। নুরুল ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংগঠনগুলো সুপ্রিম কোর্টে রিটের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জন্য আবেদন জমা রেখেছেন। আদালতের দেরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারটি আর্থিক ও মানসিকভাবে আরও চাপের মুখে।
নুরুল ইসলাম আশা প্রকাশ করছেন, নতুন সরকারের অধীনে মামলাটি দ্রুত সমাধান হবে এবং তার সন্তানদের শিক্ষার জন্য সরকারিক সহায়তা প্রদান করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “আমার মেয়ের হত্যার দায়ীকে শাস্তি দিতে হবে, এবং আমার বাকি সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হবে।”



