ভারতে আরোপিত নতুন রপ্তানি বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি খরচ বাড়ে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী সময়ে রপ্তানি পরিমাণ আরও হ্রাস পেতে পারে।
কোভিড-১৯ পরবর্তী ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতকে ১৯৯ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছিল। পরবর্তী দুই বছর ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশকে অষ্টম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে রেকর্ড করেছে, যেখানে রপ্তানি মূল্য ১৭৬ কোটি ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে স্থলবন্দর মারফত সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। এর পর ভারত তিন ধাপে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। প্রথম দুই ধাপ (১৭ মে ও ২৭ জুন) পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা-সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও কাঠের আসবাবকে লক্ষ্য করে, আর তৃতীয় ধাপ (১১ আগস্ট) অতিরিক্ত পাটপণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
বিধিনিষেধের শর্ত অনুযায়ী পাট ও পোশাক পণ্য এখন শুধুমাত্র মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দর (নভা শেবা) দিয়ে রপ্তানি করা যাবে; স্থলবন্দরে রপ্তানি নিষিদ্ধ। খাদ্যপণ্য, কোমল পানীয়, কাঠের আসবাব, তুলা-সুতার বর্জ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত স্থলবন্দর ব্যবহার করা অনুমোদিত, যেখানে বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি মূল্য প্রায় ৩০ কোটি ডলার, যা একই সময়ে গত বছরের ৩২.৫ কোটি ডলারের তুলনায় ৮.৮ শতাংশ কমেছে। রপ্তানিকারকরা জানান, ৫০ শতাংশের কাছাকাছি কন্ট্রারিভ্যাল শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে পোশাকের অর্ডার কমে গেছে, ফলে ভারতীয় ক্রেতারা বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কম দামে অফার করছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য জিএসটি মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে রপ্তানিকারকরা বিকল্প বিক্রয় চ্যানেল ব্যবহার করতে পারেন। একই সময়ে, বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো ভারতীয় বাজারের জন্য বাংলাদেশে উৎপাদন করে, কিন্তু এখন ভারতীয় উৎপাদনকারীরা কম দামে পণ্য সরবরাহ করে, যা বাংলাদেশি রপ্তানির প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সামুদ্রিক পথে পণ্য পরিবহন সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল, ফলে রপ্তানি খরচ বাড়ছে। এই কারণেই ভারতীয় বাজারে তৈরি পোশাকের রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। রপ্তানিকারকরা উল্লেখ করেন, যদি বিধিনিষেধ শিথিল না হয় এবং বিকল্প রপ্তানি পথ না তৈরি হয়, তবে রপ্তানি পরিমাণে আরও বড় পতন ঘটতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, বর্তমান বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মুনাফা মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে। বিকল্প রপ্তানি গন্তব্যের সন্ধান, সমুদ্রপথের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রয় সম্প্রসারণই ভবিষ্যৎ রপ্তানি স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ভারতীয় রপ্তানি বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি খরচ বাড়ছে, প্রতিযোগিতা কমছে এবং রপ্তানি পরিমাণে হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে। রপ্তানিকারকদের জন্য দ্রুত বিকল্প বাজার ও লজিস্টিক সমাধান খোঁজা জরুরি, যাতে রপ্তানি আয় স্থিতিশীল রাখা যায়।



