কুরিগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলায় অবস্থিত অনন্তপুর সীমান্তে ৭ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে কিশোরী ফেলানি খাতুনকে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গুলি করে প্রাণ হারায়। তার পরিবার দাবি করে, সীমান্ত পারাপার করার সময় গুলি হওয়ার পর তার দেহ বারবেড তারের ওপর প্রায় চার ঘণ্টা আধা সময় ঝুলে থাকে, ফলে ন্যায়বিচার এখনো পূর্ণ হয়নি।
ফেলানি ছিলেন নূর ইসলাম ও কলোনিটারি গ্রাম, রামখানা ইউনিয়নের বাসিন্দা, তার পরিবার পূর্বে ভারতের বঙাইগাঁও জেলায় বসবাস করত। বিবাহের জন্য বাংলাদেশে ফিরে আসতে গিয়ে পরিবারটি অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিল। সকাল প্রায় ছয়টায় ফেলানি সিঁড়ি ব্যবহার করে বারের ওপর চড়ে যাওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে আহত হয়। তিনি প্রায় অর্ধ ঘন্টা বেঁচে ছিলেন, তবে শীঘ্রই মৃত্যু বরণ করেন।
গোলাগুলির পর থেকে ফেলানির দেহ প্রায় চার ঘণ্টা পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় আন্তর্জাতিক সীমান্তের বারবেড তারের ওপর ঝুলে থাকে। এই দৃশ্যকে দেখার পর স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থা ব্যাপক নিন্দা প্রকাশ করে।
আইনি প্রক্রিয়া দুই বছর পরই শুরু হয়। ১৩ আগস্ট ২০১৩ তারিখে কোচবাহার জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে প্রথম ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হয়। ফেলানির পিতা নূরুল ইসলাম ও চাচা হানিফ উদ্দিন আদালতে সাক্ষ্য দেন। তবে ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে আদালত বিএসএফের সদস্য অমিয়া ঘোষকে মুক্তি দেয়।
পরিবারের আপত্তি স্বীকার করে, একই বছর ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে পুনরায় ট্রায়াল শুরু হয়। নূরুল ইসলাম আবার ১৭ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে সাক্ষ্য দেন। তবে ২ জুলাই ২০১৫ তারিখে আদালত অমিয়া ঘোষকে দ্বিতীয়বারও মুক্তি দেয়, যদিও তিনি আত্মসমর্পণকারী অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন।
বিএসএফের এই দুইবারের মুক্তির পর ফেলানির পিতার পক্ষ থেকে ১৪ জুলাই ২০১৫ তারিখে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিটের পিটিশন দায়ের করা হয়। এই পিটিশনের সমর্থনে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) যুক্ত হয়। ৬ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু হয়, তবে এরপরের কার্যক্রমে দীর্ঘ বিলম্ব দেখা যায়।
বছরের পর বছর কোর্টের আদেশ, আপিল ও রিটের পিটিশনের ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও ফেলানির পরিবার এখনও ন্যায়বিচারের পূর্ণতা পাননি। ২০২৬ সালের বর্তমান অবস্থায়ও মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে চলমান রয়েছে, এবং পরিবারের দাবি অনুযায়ী কোনো চূড়ান্ত রায় বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি।
ফেলানির মৃত্যুর ঘটনা সীমান্ত পারাপার সংক্রান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। তবে আইনি দিক থেকে এখনও স্পষ্ট কোনো ফলাফল না পাওয়ায় পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীরা ন্যায়বিচারের জন্য অব্যাহত চাপ বজায় রেখেছে।
এই মামলায় মূল বিষয় হল সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও তার ফলে সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি, যা আইনি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান প্রয়োজন। ভবিষ্যতে একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে উভয় দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নীতি ও মানবাধিকার রক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।



