গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতে হোয়াইট হাউস সব ধরনের উপায়, যার মধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত, নিয়ে আলোচনা করছে বলে জানানো হয়েছে। এই তথ্য বুধবার (৭ জানুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার নিরাপত্তা দল গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সম্ভাব্য সব বিকল্পের মূল্যায়ন করছে। সামরিক শক্তি ব্যবহারসহ অন্যান্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পন্থা নিয়ে বিশদ আলোচনা চলছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে বিকল্পগুলোর তালিকায় সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা স্পষ্ট করা হয়েছে।
ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমেরিকান প্রভাব বাড়ানোর ইচ্ছা এই মুহূর্তে নতুন মাত্রা পেয়েছে। তার প্রশাসনের নিরাপত্তা পরামর্শদাতারা দ্বীপের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, নতুন সমুদ্রপথ এবং বিরল খনিজ সম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে দেখছে। ফলে, ট্রাম্পের দল এই বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো, বিশেষ করে ন্যাটো সদস্যরা, এই সম্ভাব্য পদক্ষেপকে তীব্র উদ্বেগের বিষয় হিসেবে প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেনসহ ছয়টি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র অধিকার ডেনমার্ক ও দ্বীপের বাসিন্দাদেরই রয়েছে বলে জোর দিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের হঠকারী সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ন্যাটোর মৌলিক নীতির প্রতি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ডেনমার্ক, যা গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে রাজনৈতিকভাবে পরিচালনা করে, এই অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে। ডেনমার্কের সরকার এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন ও ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা ওয়াশিংটনকে হঠকারী কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সংলাপের পথে এগোতে আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজার, যা তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও ন্যাটো এবং বিশ্ব শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতকে ন্যাটোর আদর্শের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে, এই অঞ্চলকে ঘিরে থাকা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর উপর নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আর্কটিকের গলিত বরফের ফলে নতুন বাণিজ্যপথের উন্মোচন এবং সেখানে সমৃদ্ধ বিরল খনিজ সম্পদের উপস্থিতি গ্রিনল্যান্ডকে কৌশলগতভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এই পরিবর্তনগুলোই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে। তাই, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে এই ভূ-রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে নিজের কাব্জায় নিতে চায় বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে ডেনমার্কের দীর্ঘমেয়াদী মিত্র হিসেবে এই দ্বীপের স্বায়ত্তশাসনকে হুমকি দেওয়া দুই তীরের আটলান্টিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমানে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপগুলো স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনার ফলাফল এবং ডেনমার্কের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে কীভাবে বিকশিত হবে তা নির্ধারণ করবে। ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোও এই বিষয়ে সমন্বিত নীতি গঠন করতে পারে, যাতে আর্কটিকের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
সংক্ষেপে, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দ্বীপকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। হোয়াইট হাউসের সামরিক বিকল্প বিবেচনা ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, আর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দাবি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের সমঝোতা হবে, তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও আর্কটিকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



