বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নতুন নির্দেশিকা জারি করে আবাসন ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ পুনর্গঠন করেছে। এই পরিবর্তন ভোক্তা ঋণ সংক্রান্ত প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশনের ২৩ নম্বর বিধি সংশোধনের মাধ্যমে কার্যকর হয়। নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়া এবং রিয়েল এস্টেট চাহিদা বৃদ্ধিকে লক্ষ্য করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রকাশিত সার্কুলারটি বিদ্যমান আবাসন ঋণ পোর্টফোলিও পরিচালনার সক্ষমতার সঙ্গে ঋণ সীমা সরাসরি যুক্ত করে। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক তার মোট শ্রেণিকৃত (খেলাপি) আবাসন ঋণের অনুপাতের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ দিতে পারবে তা নির্ধারিত হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতা উভয়ই বিবেচনা করে।
শ্রেণিকৃত আবাসন ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশের নিচে থাকা ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সীমা বাজারে উচ্চতর ক্রেডিটযোগ্যতা বজায় রাখা ব্যাংকগুলোর জন্য গৃহঋণ সরবরাহ বাড়াতে সহায়ক হবে।
যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত আবাসন ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে, তাদের সর্বোচ্চ ঋণ সীমা তিন কোটি টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এই স্তরে থাকা ব্যাংকগুলোকে মাঝারি ঝুঁকি গ্রহণের জন্য সীমিত ক্রেডিট সুবিধা প্রদান করা হয়।
শ্রেণিকৃত আবাসন ঋণের অনুপাত ১০ শতাংশের বেশি হওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ঋণ সীমা দুই কোটি টাকা নির্ধারিত হয়েছে। উচ্চতর নন-পারফরমিং অ্যাসেট (এনপিএ) অনুপাতের ফলে এই ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক ঋণদান পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাতের ক্ষেত্রে ৭০:৩০ সীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা গৃহঋণের নিরাপত্তা মার্জিন বজায় রাখে। পাশাপাশি, ঋণগ্রহীতার যথাযথ নিট নগদ আয় নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে কিস্তি পরিশোধে কোনো ঘাটতি না থাকে।
এই নীতিমালা ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ধারার অধীনে জারি করা হয়েছে এবং ২০০৪ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত পূর্ববর্তী নির্দেশনাগুলোকে প্রতিস্থাপন করে। নতুন নির্দেশিকায় ভোক্তা ঋণ সংক্রান্ত অন্যান্য বিধান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা সামগ্রিক ঋণ নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।
নির্মাণ খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধি গৃহমালিকদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে; নতুন ঋণ সীমা এই চাপ কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সীমা বাড়ানো হলে সম্ভাব্য ক্রেতারা কম সুদে এবং যথাযথ শর্তে গৃহঋণ পেতে সক্ষম হবেন।
অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ হ্রাসের জন্য প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে। ঋণ সীমা কমে গেলে উচ্চ এনপিএ অনুপাতের ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি হ্রাসের জন্য কড়া ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে, যা সামগ্রিক সিস্টেমিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি গৃহঋণ বাজারে ক্রেডিট প্রবাহকে সমন্বিত করতে সহায়তা করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ঋণদানের শর্তগুলো যদি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল থাকে, তবে গৃহ নির্মাণ ও সম্পত্তি লেনদেনের গতি পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে, ঋণ সীমা হ্রাসের ফলে উচ্চ এনপিএযুক্ত ব্যাংকগুলোতে ঋণ সরবরাহে সংকোচন দেখা দিতে পারে, যা কিছু সেক্টরে স্বল্পমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পুনর্নির্ধারণ গৃহঋণ বাজারে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও ক্রেডিট প্রবেশযোগ্যতা উভয়ই সমন্বয় করার লক্ষ্য রাখে। নীতি বাস্তবায়নের পর বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং ব্যাংকগুলোর এনপিএ ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, তা ভবিষ্যৎ ঋণ প্রবণতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



