২০১১ সালের ৯ জুলাই, কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলায় অনন্তপুর সীমান্তে ১৫ বছর আগে এক কিশোরীকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত করা হয়। সেই দিনটি আজ ১৫তম বার স্মরণ করা হচ্ছে, তবে তার পরিবার এখনও কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত।
ফেলানী তার পিতার সঙ্গে ৯৪৭ নম্বর আন্তর্জাতিক সড়কের ৩ নম্বর সাব‑পিলার পার হয়ে কাঁটাতার অতিক্রম করে দেশে ফেরার পথে ছিল। চৌধুরীহাট ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ তার ওপর গুলি চালায় এবং গুলিবিদ্ধ কিশোরীটি কাঁটাতারের ওপর ঝুলে থাকে। গুলির পর থেকে তার দেহ প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ঝুলে থাকে, এরপর দেহটি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পরপরই পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে আবেদন করে, তবে দশকেরও বেশি সময় পার হওয়া সত্ত্বেও কোনো দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরিবারকে ধারাবাহিকভাবে বিচারের প্রত্যাশা করতে হয়েছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া এখনও স্পষ্ট নয়।
গত মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে ফেলানীর পরিবারকে দেখা যায়। তারা কবরস্থান ও আশপাশের পরিষ্কার‑পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। পরিবার সদস্যরা কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরীর দৃশ্যের কষ্টদায়ক স্মৃতি এখনও তাড়া করে।
ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারা জানান, রাত্রিকালীন ঘুম ভেঙে যায় মেয়ের আর্তচিৎকারের কল্পনা দিয়ে। তাদের মতে, কাঁটাতারে গুলিবিদ্ধ পাখির মতো ঝুলে থাকা দৃশ্য এখনও চোখের সামনে ভাসে। এই দুঃখের স্মৃতি তাদেরকে দিন‑রাত শোকের মধ্যে রাখে।
মানবাধিকার সংস্থা এবং অন্যান্য সামাজিক সংগঠনগুলোও পরিবারকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন স্তরে আবেদন জমা দিয়েছে, তবে এখনো কোনো ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। পরিবার দাবি করে যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসারে তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।
সীমান্তে ঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পর, গুলশান‑২ থেকে প্রগতি স্মরণী পর্যন্ত সড়কের নাম “ফেলানী সড়ক” রাখা হয়। এই নামকরণটি গত ৯ ডিসেম্বর সরকারীভাবে ঘোষিত হয়, যা পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীদের জন্য একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, পিপলস অ্যাকটিভিস্ট কোয়ালিশন (প্যাক) গুলশানে ভারতীয় দূতাবাসের সংলগ্ন সড়কের নাম “শহীদ ফেলানী সড়ক” ঘোষণা করে এবং সেখানে নামফলক স্থাপন করে। এই উদ্যোগটি সীমান্তে ঘটিত হত্যার প্রতি প্রতিবাদ ও স্মরণীয় চিহ্ন হিসেবে কাজ করেছে।
প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি “ফেলানী দিবস” হিসেবে ঘোষিত হয়। এই দিনটি পরিবার, নাগরিক পরিষদ এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে ন্যায়বিচার, আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং ফেলানীর নামের স্মরণীয় স্থানগুলোর নামকরণ দাবি করে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বারিধারা পার্ক রোডের নাম “ফেলানী স্মরণী” রাখার দাবিও এই আন্দোলনের অংশ।
নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন জানান, যদিও তাদের দাবিকৃত সব নামকরণ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তবু গুলশান‑২ থেকে প্রগতি স্মরণী পর্যন্ত সড়কের নাম ফেলানী সড়ক রাখা হয়েছে দেখে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে সরকারী স্তরে কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব করা হয়েছিল, তবে তা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি।
বিএসএফের গুলিবিদ্ধ কিশোরীর মামলাটি বর্তমানে হরিপুর জেলা আদালতে চলমান। তদন্তকারী সংস্থা এখনও কোনো সন্দেহভাজনকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেনি, এবং মামলায় প্রমাণের ঘাটতি ও সীমান্তে ঘটিত ঘটনার জটিলতা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবার আদালতের অগ্রগতির জন্য প্রত্যাশা করে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
ফেলানীর মৃত্যুর পর থেকে পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক গোষ্ঠী একত্রে ন্যায়বিচার ও স্মরণীয় পদক্ষেপের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও কিছু নামকরণ ও প্রতীকী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে প্রকৃত শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ এখনো অমীমাংসিত। এই দুঃখজনক ঘটনা বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে এবং ভবিষ্যতে সমাধানের জন্য চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।



