নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক উত্তেজনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে চলেছে। গত ১২ মাসে রাজনৈতিক সংঘাতে ১৩৩ জনের মৃত্যু এবং ৭,৫১১ জনের আঘাতের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে প্রায় চার হাজার হত্যা সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে।
হাতিয়ার ব্যবহার করে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা বাড়ার ফলে জনসাধারণের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশিরভাগ অপরাধে সন্দেহভাজীদের গ্রেপ্তার করা হয়নি; কিছু ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুবিধা নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা দাবি করে যে দেশের নিরাপত্তা অবস্থা সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল, তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রত্যাশিত উন্নতির পরিবর্তে অবনতি ঘটেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, সামাজিক সংঘাত, বেকারত্ব এবং মাদকাসক্তি ইত্যাদি কারণগুলো অপরাধের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত বছর সারা দেশে মোট প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ১১ মাসে বিভিন্ন থানায় ৩,৫০৯টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
অপরাধের পরিসর কেবল হত্যা নয়; নারী ও শিশুর নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা এবং ডাকাতির মতো ঘটনার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। আগস্ট ২০২২ থেকে আগস্ট ২০২৩ পর্যন্ত ১৩ মাসে মোট ৩৯,৯৩৬টি অপরাধমূলক মামলা দায়ের হয়েছে, যা গড়ে প্রতি মাসে ৩,০৭২টি এবং প্রতিদিন প্রায় ৭২টি মামলা।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত একই সময়ে মোট ৩৬,৩১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩,০২১টি বেশি। এই বৃদ্ধি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উদ্বেগকে তীব্র করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের প্রথম দশ মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় বিশটি হত্যা ঘটেছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী গড়ে প্রতি মাসে ৩১টি হত্যা নথিভুক্ত হয়েছে, যা সামগ্রিক প্রবণতা নির্দেশ করে।
ডিএমপি গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান যে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ফলাফল পাওয়া গেছে, অন্য কিছু মামলায় এখনও তদন্ত চলমান। এই তথ্যগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন, বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিরাপত্তা সংস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে এবং অপরাধের হার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক হানাহানি, সামাজিক বিরোধ, বেকারত্বের হার এবং মাদকদ্রব্যের ব্যবহার অপরাধের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এ ধরনের কারণগুলো মোকাবিলায় কেবল আইনগত ব্যবস্থা নয়, সামাজিক নীতি ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুসারে, অপরাধের শিকারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে গুলি করে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে দ্রুত গ্রেপ্তার ও তদন্তের অভাব জনসাধারণের আস্থা হ্রাসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক সমস্যার সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য চলমান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, হত্যা, আঘাত এবং অপরাধমূলক মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনী সময়ে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।



