জাফর পানাহি, ইরানের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চলচ্চিত্র নির্মাতা, সম্প্রতি এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ পেয়েছেন। ইরানীয় বিচারিক কর্তৃপক্ষ তাকে “প্রচারমূলক কার্যকলাপ” করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তবুও, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত তার প্রথম ট্যুরের শেষের পরই ইরানে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে তার শিল্পের স্বাধীনতা ও সমকক্ষদের পরিস্থিতি উল্লেখ করা হয়েছে।
পানাহি ২০১৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার শিকার ছিলেন, যা তার কাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ২০২৩ সালে নিষেধাজ্ঞা বাতিল হওয়ার পরই তিনি ক্যান্সের এই বছরের বিশ্বপ্রিমিয়ারে “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান এক্সিডেন্ট” চলচ্চিত্রটি উপস্থাপন করেন। এই চলচ্চিত্রটি তার জেলখানায় কাটানো সময় এবং কঠিন শর্তে সাক্ষাৎ করা মানুষের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত।
ক্যান্সে প্রদর্শিত হওয়ার পর “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান এক্সিডেন্ট” প্যাল্ম দ’ওয়ার্ড জয় করে, যা পানাহির ক্যারিয়ারে প্রথম বড় পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত। চলচ্চিত্রের তীক্ষ্ণ হাস্যরস এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ আন্তর্জাতিক সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। এই সাফল্য তাকে বিশ্বব্যাপী পুরস্কার দৌড়ে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
উত্তর আমেরিকায় চলচ্চিত্রের বিতরণকারী নীয়ন, নভেম্বর মাসে জানায় যে পানাহি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো ট্যুরের সূচনা করবেন। ট্যুরের মূল উদ্দেশ্য ছিল চলচ্চিত্রের স্ক্রিনিং এবং দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা। এই প্রচারমূলক সফরটি তার দশকের বেশি সময়ের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পর প্রথম আন্তর্জাতিক সফর হিসেবে গুরুত্ব পায়।
ট্যুরের প্রথম স্টেশন নিউ ইয়র্কের লিঙ্কন সেন্টার, যেখানে দর্শকরা চলচ্চিত্র দেখার পাশাপাশি পরিচালকের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর সেশনে অংশ নিতে পেরেছেন। লিঙ্কন সেন্টারের পর ট্যুরটি মরক্কো, জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় শহরে অব্যাহত থাকে। প্রতিটি স্থানে স্থানীয় চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে সমন্বয় করে স্ক্রিনিং এবং আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়।
লিঙ্কন সেন্টারের শেষ দিনেই ইরানের আদালত পুনরায় পানাহিকে এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেয় এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা পুনঃপ্রয়োগ করে। এই সিদ্ধান্তটি ট্যুরের মাঝখানে প্রকাশিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করে। তবে পানাহি নিউ ইয়র্কে ছিলেন, যেখানে গথাম অ্যাওয়ার্ডসের রাতের অনুষ্ঠান চলছিল।
গথাম অ্যাওয়ার্ডসে পানাহি পরিচালনা ও চিত্রনাট্য বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন। পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি চলচ্চিত্রের বার্তা এবং মানবাধিকার বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন। এই সময়ে তিনি ট্যুরের পরবর্তী স্টপগুলোতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন চালিয়ে যান, যার মধ্যে মরক্কো ও জার্মানির প্রধান চলচ্চিত্র উৎসব অন্তর্ভুক্ত।
ট্যুরের শেষ পর্যায়ে পানাহি নিউ ইয়র্কে ফিরে আসেন এবং নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ক্রিটিক্স সার্কেলের “সেরা পরিচালক” পুরস্কার গ্রহণ করেন। এই সম্মান তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও দৃঢ় করে। একই সঙ্গে “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান এক্সিডেন্ট” বিভিন্ন প্রধান পুরস্কার অনুষ্ঠানে মনোনয়ন পেয়েছে, যার মধ্যে আসন্ন একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সেরা বিদেশি চলচ্চিত্র বিভাগ অন্তর্ভুক্ত।
পানাহি উল্লেখ করেন যে তার মতোই বহু ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা একই ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। তিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ের সমর্থনকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, যে এই সমর্থনই শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার ফিরে আসার সিদ্ধান্ত এবং চলমান ট্যুর ইরানি চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে।



