কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত তৃতীয় বর্ষের পঞ্চম সেমিস্টার পরীক্ষার সময় দুই শিক্ষার্থীর হিজাব সরিয়ে ফেলার অভিযোগে ইংরেজি বিভাগের প্রধান শাশ্বতী হালদারকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক উন্মোচিত হয়েছে। পরীক্ষার সময় নকলের অভিযোগে তল্লাশি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হালদারকে দুই শিক্ষার্থীকে হিজাব খুলতে বলার অভিযোগ ওঠে।
শাশ্বতী হালদার দাবি করেন, তিনি নকল প্রতিরোধের জন্যই পরীক্ষা কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে হিজাব খুলতে বলেছিলেন এবং কোনো চিটিং সামগ্রী পাওয়া যায়নি। হিজাব খুলে দেখা গেল শিক্ষার্থীর কাছে কোনো নকল উপকরণ নেই, এরপর তিনি দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেন এবং অতিরিক্ত দশ মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন।
এই ঘটনার পর ২৪ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দুই শিক্ষার্থী হাতে ‘মাই বডি মাই চয়েস’ ও ‘সে নো টু ইসলামোফোবিয়া’ লেখা পোস্টার তুলে বিতর্ককে তীব্রতর করে। পোস্টারসহ বিক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী অভিযোগ দায়ের করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়।
বিষয়টি নিয়ে সোমবার ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি প্রথম বৈঠক করে এবং উপাচার্যকে সুপারিশপত্র পাঠায়। কমিটি পরামর্শ দেয় যে, তদন্ত চলাকালীন শাশ্বতী হালদারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে না থাকাই উত্তম হবে। এই সুপারিশের পর শাশ্বতী হালদার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছুটিতে যান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শাশ্বতী হালদার ছুটির জন্য আবেদন করেছিলেন এবং তা অনুমোদিত হয়েছে। তিনি ৭ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৪ দিনের ছুটি নিয়েছেন। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, শাশ্বতী ব্যক্তিগত কারণে ছুটি চেয়েছিলেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন।
ছুটির সময়কালে শাশ্বতীর সঙ্গে উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মঙ্গলবার সকালে কথা বলেন এবং এরপরই ছুটির অনুমোদন নিশ্চিত হয়। শাশ্বতী নিজে উল্লেখ করেন, তিনি মঙ্গলবার দুপুরে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে ছুটির আবেদন করেন এবং তা গৃহীত হয়েছে।
ইংরেজি বিভাগের প্রধানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে হিজাব সংক্রান্ত নীতি ও শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা চলছে। কিছু শিক্ষার্থী ও মানবাধিকার সংগঠন হিজাব পরিধানের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে কিছু গোষ্ঠী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও পরীক্ষার ন্যায্যতা বজায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা দাবি করে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উল্লেখ করেছে, হিজাব সরিয়ে ফেলার ঘটনা পরীক্ষার সময় নকল প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ঘটেছে এবং কোনো ধর্মীয় বৈষম্যের ইচ্ছা ছিল না। তবে এই ব্যাখ্যা কিছু অংশে সমালোচনার মুখে পড়েছে, কারণ হিজাব সরিয়ে ফেলার পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীর সম্মতি না নিয়ে করা কাজকে অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া চালু করেছে এবং ফলাফল প্রকাশের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে, শিক্ষার্থীদের জন্য হিজাব সংক্রান্ত স্পষ্ট নীতি তৈরি করা এবং পরীক্ষার সময় নকল প্রতিরোধের জন্য বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
শিক্ষা সংক্রান্ত এই ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীর অধিকার ও শিক্ষকের দায়িত্বের মধ্যে সূক্ষ্ম সমতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। শিক্ষার্থীরা যদি ধর্মীয় পোশাক পরিধান করে, তবে তা তাদের শিক্ষার অধিকারকে বাধা দেয় না; অন্যদিকে, শিক্ষকেরাও নকল প্রতিরোধে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীর গৌরব ও নিরাপত্তা উভয়ই রক্ষা পায়।
এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক টিপস: পরীক্ষার সময় যদি কোনো নিরাপত্তা বা নকল সন্দেহ হয়, তবে তা সরাসরি পরীক্ষার তত্ত্বাবধায়কের কাছে জানিয়ে সমাধান চাওয়া উচিত, নিজের বা অন্যের ধর্মীয় পরিচয়কে ঝুঁকিতে না ফেলে। একই সঙ্গে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উচিত স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ এবং সকলের জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়ানো যায়।



