ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গত অর্থবছরে আয় ঘাটতি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে ৪৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ নাগাদ ঘাটতি প্রায় ৭,৮৭৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের ১,৪০৬ কোটি টাকার তুলনায় ছয় গুণের বেশি।
এই বিশাল ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে সরকারী ভর্তুকি ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য মূল পণ্যের বর্ধিত সরবরাহকে উল্লেখ করা হয়েছে। টিসিবি ২০২২ সাল থেকে ট্রাক বিক্রির পরিবর্তে পরিবারিক কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি পরিবারের কাছে সস্তা মূল্যে খাবার সরবরাহে মনোযোগ দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সাধারণত অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রকাশ করে, তবে এইবার পুরো বছরের তথ্য প্রকাশের জন্য তা আগে প্রকাশ করা হয়েছে। পর্যালোচনায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার আর্থিক অবস্থা বর্ণনা করতে পূর্বের ‘লাভ-ক্ষতি’ শব্দের পরিবর্তে ‘অধিকাংশ-অধিকাংশ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য মুনাফা নয়, সামাজিক সেবা প্রদান হওয়াকে তুলে ধরে।
টিসিবি এই বছর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি রেকর্ড করেছে। শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি), যার ঘাটতি ৮,৮০৩ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড করা ১১,১৬৩ কোটি টাকার নিচে রয়েছে।
টিসিবি গত বছর প্রায় ২,৮০০ কোটি টাকার সরকারী ভর্তুকি পেয়েছে। এই ভর্তুকি বাড়ার পেছনে সংস্থার কভারেজ এক কোটি পরিবারের কাছে বিস্তৃত করা হয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ভর্তুকি ছাড়া সংস্থা বিক্রয়মূল্য ক্রয়মূল্যের নিচে নির্ধারণের ফলে আর্থিক স্বনির্ভরতা বজায় রাখতে সমস্যার মুখোমুখি।
২০২২ সালে টিসিবি ট্রাক বিক্রির মডেল থেকে সরে এসে পরিবারিক কার্ডের মাধ্যমে মূল খাদ্য সামগ্রী সস্তা দরে বিতরণ শুরু করে। এই নীতি অনুসারে সংস্থা মূল্যের তুলনায় কম দামে পণ্য বিক্রি করে, ফলে বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত আয় ক্রয় ব্যয়ের চেয়ে কম হয়। ফলে সরকারী সহায়তা ছাড়া কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ইনফ্লেশনও সংস্থার আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তুলেছে। নভেম্বর মাসে মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছায়, যা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মাত্রায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশেষ করে স্থির বা কম আয়ের গৃহস্থালির জন্য অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছু মতামত রয়েছে যে টিসিবির ঘাটতি শুধুমাত্র সামাজিক সেবা বৃদ্ধির ফল নয়, বরং কার্যকরী অদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যার প্রতিফলন। ম. মাসরুর রিয়াজ, সংশ্লিষ্ট সংস্থার চেয়ারম্যান ও সিইও, এই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন, যদিও বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়নি।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে টিসিবির আর্থিক ঘাটতি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। সরকারী ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়লে ভবিষ্যতে বাজেটের চাপ বাড়তে পারে এবং নীতি নির্ধারণে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন হবে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা বিবেচনা করলে, মুদ্রাস্ফীতি যদি উচ্চ মাত্রায় বজায় থাকে এবং ভর্তুকি বৃদ্ধি না পায়, তবে টিসিবি আর্থিক ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যদি সরকারী সহায়তা ও বিতরণ নেটওয়ার্কের দক্ষতা উন্নত করা যায়, তবে সংস্থার আর্থিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
সংক্ষেপে, টিসিবির আয় ঘাটতি বৃদ্ধি দেশের সামাজিক সেবা নীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে জটিল সম্পর্ককে প্রকাশ করে। সংস্থার কার্যক্রমের টেকসইতা নিশ্চিত করতে ভর্তুকি, মূল্য নির্ধারণ এবং পরিচালনাগত দক্ষতার সমন্বিত সমাধান প্রয়োজন।



