মাদারীপুরের কাজীবাকাই ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাউতলী গ্রামে গত সপ্তাহে বিদেশি বউ ও কন্যাসন্তানসহ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সজিব বেপারীর গৃহে ঐতিহ্যবাহী বিয়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সজিব, যিনি সাত বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মসংস্থান খোঁজার জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেখানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মাহেরা দত্তের সঙ্গে পরিচয় করেন এবং ২০২৩ সালের ১৮ জুন দুজনের বিবাহ হয়। দুজনের সন্তান হিসেবে একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করেছে।
সজিবের পরিবারে এই বিবাহের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামবাসীরা রঙিন সাজসজ্জা, হলুদ পোশাক এবং ঐতিহ্যবাহী বৌভাতের জন্য প্রস্তুত হয়। স্থানীয় মানুষজনের ভিড়ের মধ্যে গাড়ি থামিয়ে, দম্পতির আগমন দেখার জন্য অপেক্ষা করা হয়। অনুষ্ঠানটি গৃহস্থালির সাদামাটা সাজে হলেও, বিদেশি বউয়ের উপস্থিতি গ্রামকে এক নতুন রঙে রাঙিয়ে তুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় কেপটাউনের আলেকজান্ডার এলাকায় সজিব একটি সুপারশপ পরিচালনা করেন। চার বছর আগে সেখানে মাহেরার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং পারিবারিক সম্মতির ভিত্তিতে বিবাহের সিদ্ধান্ত নেয়। দুজনের মিলন থেকে গড়ে ওঠা ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সমর্থনকে গ্রামবাসীরা প্রশংসা করে। দম্পতি দুজনেরই পরিবার এই সম্পর্ককে স্বাগত জানায় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
মাহেরা দত্ত, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিক, তার মন্তব্যে তিনি সজিবের আন্তরিকতা ও সদয় স্বভাবের প্রশংসা করেন এবং বলেন, “তার সঙ্গে কথা বললে মন শান্ত হয়, ধীরে ধীরে ভালোবাসা গড়ে ওঠে।” সজিবও একই রকম অনুভূতি প্রকাশ করে, “প্রবাসে থাকায়ই আমাদের পরিচয় হয়, ভালোবাসা থেকেই বিবাহ। আমাদের পরিবার দুজনের সিদ্ধান্তে সমর্থন করেছে এবং এখন জীবন সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।”
সজিবের মা, লিপি বেগম, প্রথমে বিদেশি বউয়ের সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করলেও, দম্পতির উপস্থিতি ও আচরণ দেখে তার ধারণা বদলে যায়। তিনি বলেন, “অল্প বাংলা জানে, বাকি ইশারায় বুঝে নেয়। খুব ভালো মেয়ে।” সজিবের বাবা, মিন্টু বেপারী, সকলকে দোয়া চেয়ে বলেন, “সবার কাছে দোয়া চাই—ওরা যেন সারাজীবন ভালো থাকে।”
দম্পতি এই মাসের শেষের দিকে আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে তারা ব্যবসা ও কর্মজীবন চালিয়ে যাবে এবং সন্তানকে আন্তর্জাতিক পরিবেশে বড় হতে সুযোগ দেবেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রামবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে; কেউ কেউ তাদের জন্য শুভকামনা জানায়, আবার কেউ তাদের ফিরে যাওয়া নিয়ে কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করে।
এই ধরনের আন্তঃসাংস্কৃতিক বিবাহ বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম দিককে উন্মোচিত করে। উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয়গুলো সম্প্রতি কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ক্ষেত্রে তরুণ প্রবাসীদের জন্য সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ উচ্চ কমিশন, দক্ষিণ আফ্রিকায়, এক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “প্রবাসী সম্প্রদায়ের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ে এবং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া শক্তিশালী হয়।” এ ধরনের ব্যক্তিগত গল্পগুলো দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বকে মানবিক মাত্রা যোগায়।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের মধ্যে ব্যবসা, আইটি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। এই ধরনের বিবাহগুলো কেবল সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা দু’দেশের শ্রমবাজারে নতুন সংযোগ স্থাপন করে।
দক্ষিণ আফ্রিকান সরকারও বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলার জন্য ভিসা ও বসবাসের শর্ত সহজ করেছে, যা বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। একইসঙ্গে, বাংলাদেশ সরকারও বিদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য কনসুলার সেবা ও তথ্য সরবরাহে মনোযোগ বাড়িয়ে চলেছে, যাতে তারা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
সজিব ও মাহেরার বিবাহের পরবর্তী ধাপগুলো, যেমন সন্তানকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রদান এবং দু’দেশের ব্যবসায়িক সুযোগগুলো কাজে লাগানো, ভবিষ্যতে আরও বহু পরিবারকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সংহতি ও বৈচিত্র্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম স্তরে মানবিক সংযোগের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করছে।
দক্ষিণ ভাউতলী গ্রামে এই বিয়ের আয়োজনের মাধ্যমে দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজেও বৈশ্বিক প্রবাহের প্রভাব স্পষ্ট। ভবিষ্যতে এমন আরও গল্পের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিকের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা দুই দেশের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে।



