যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেওয়ার পর থেকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমেরিকান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ডেনমার্কের অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয়। ট্রাম্পের মতে, জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা জরুরি।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর, ট্রাম্প আবার গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের ইঙ্গিত দেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়ে বলেন, আগামী বিশ দিনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
ভেনেজুয়েলায় এই অনন্য ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ট্রাম্পের হুমকি ডেনমার্কের নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে জানান, যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে ন্যাটো জোটের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
ডেনমার্কের সমর্থনে, ইউরোপের ছয়টি মিত্র দেশ—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন—একত্রে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এই বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও অধিকার গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদেরই। এছাড়া, আর্কটিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, এবং জাতিসংঘের সনদের নীতিমালা, বিশেষ করে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কেন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ওপর নজর দিচ্ছেন, তা নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, দ্বীপটির বিশাল খনিজ সম্পদ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের বেশিরভাগ খনিজ সম্পদ অপ্রচলিত অবস্থায় রয়েছে, যা উন্নত দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মাইনিং সংস্থা আমার্ক মিনারেলসের সিইও এলদুর ওলাফসন উল্লেখ করেছেন, আগামী কয়েক দশকে উন্নত দেশগুলোকে বিশাল পরিমাণে খনিজের প্রয়োজন হবে, এবং গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ সেই চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পদের প্রতি আগ্রহকে কৌশলগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ডেনমার্কের সরকার ও ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করে, জোর দিয়ে বলেছেন যে কোনো বিদেশি শক্তির দ্বারা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ওপর আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের মতামতকে অগ্রাধিকার দিতে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকও সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তারা যুক্তি দেন, ন্যাটো জোটের মধ্যে এমন কোনো পদক্ষেপ যা সদস্য দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে, তা জোটের ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া, আর্কটিক অঞ্চলে চলমান পরিবেশগত ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোকে বিবেচনা করে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
অধিকন্তু, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত আলোচনায় স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের সরকার ও পার্লামেন্টের প্রতিনিধিরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তারা কোনো বিদেশি শক্তির অধিগ্রহণের বিরোধিতা করে এবং দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সমর্থন কামনা করছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দেখায়, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে, ন্যাটো ও ইউএন কাঠামোর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন। এই আলোচনায় নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার সবই সমানভাবে বিবেচনা করা হবে।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের ওপর পুনরায় জোর দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নীতি ও আর্কটিক কৌশলে নতুন মোড় আনতে পারে। তবে, ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের স্পষ্ট বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার, এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনার সূচনা করলে, তা ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে তীব্র বিতর্কের বিষয় হবে। একই সঙ্গে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত সরকার ও স্থানীয় জনগণের মতামতকে কেন্দ্র করে একটি ব্যাপক পরামর্শ প্রক্রিয়া চালু হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, এবং আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে ঘটবে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।



