বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক হিসাব প্রধান খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবালের সম্পদ জব্দের কাজ পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সম্পন্ন করেছে। সিআইডি বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) একটি সংবাদ ব্রিফিংয়ে জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ ও প্রকার উল্লেখ করে জানান দেন।
সিআইডি জানায়, জব্দকৃত স্থাবর সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকার সমান। এতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ১২টি ফ্ল্যাট, মোট ২৩ দশমিক ৫ কাঠা জমি এবং ১১টি শেয়ার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আদালতের নির্দেশে ইকবালের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকা ৩০ লাখ ৬৫ হাজার টাকাও জব্দ (ফ্রিজ) করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইকবাল ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে মোট ৯১টি গাড়ি নিবন্ধিত। সিআইডি এই গাড়িগুলোর মধ্যে ২১টি মিনিবাস এবং দুটি হাই-চ্যাপ্টার বাস জব্দ করেছে। বাকি গাড়িগুলোও তত্ত্বাবধানে আনা হয়েছে এবং আদালতের আদেশে সিআইডি প্রধানকে এসব গাড়ির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
জব্দকৃত গাড়িগুলো বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে ভাড়ায় দেওয়া হচ্ছে। রূপপুর নুক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার আয়, যা ৫৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার সমান, আদালতের অনুমোদন নিয়ে রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা গাড়িগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ সম্পদের আর্থিক প্রবাহ বন্ধ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ইকবালের অবৈধ সম্পদের উত্স সম্পর্কে সিআইডি তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি ২০০৫ সালে সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে হিসাব বিভাগের প্রধান হন। ১৪ বছরের কর্মজীবনে তিনি নিজের স্ত্রী হালিমা আক্তারের মালিকানাধীন ‘টিআই ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘মেসার্স নুসরাত ট্রেডার্স’ নামে ভুয়া বিল ভাউচার জমা দিয়ে প্রকল্পের ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। এই দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে পাঁচ বছর আগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে ইকবাল ঢাকা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে বিশাল সম্পদ গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে সিআইডি তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের করে। এর আগে, ২০২২ সালের জুনে র্যাব (রিজার্ভ আর্মি ব্যাটালিয়ন) তাদের গ্রেপ্তার করেছিল।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)ও একই সময়ে ইকবাল দম্পতির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে ২৬টি মামলা দায়ের করে, যার মধ্যে ১৩ কোটি ও ৩৮ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। দুদক ও সিআইডি বর্তমানে এই মামলাগুলো আলাদা আলাদা ভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
আদালতের আদেশমতো জব্দকৃত গাড়িগুলোর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সিআইডি প্রধানকে নিয়োগ করা হয়েছে এবং গাড়িগুলোকে রূপপুর নুক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে ভাড়া দিয়ে অর্জিত আয়কে রাষ্ট্রের কোষে জমা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া অবৈধ সম্পদের পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্নীতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিআইডি ও দুদক উভয় সংস্থা এখনো জব্দকৃত সম্পদের বিশদ হিসাব, অবৈধ লেনদেনের সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপগুলোতে আদালতের অনুমোদিত সম্পদের বিক্রয়, শেয়ার হস্তান্তর ও অবশিষ্ট ব্যাংক জমার নিষ্পত্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই মামলায় জড়িত সকল পক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা বা আপডেট পাওয়া মাত্রই জনসাধারণকে জানানো হবে।



