ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আজ প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে ইলেকশন কমিশনের (ইসিক) বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের বাসস্থান ও খাবারের খরচ বহন করার সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক এবং স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে এমনভাবে সমালোচনা করেছে।
ইসিকের এই পদক্ষেপের মূল যুক্তি ছিল বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে বলে দাবি করা। তবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, এই যুক্তি ভিত্তিহীন এবং বাস্তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
টিআইবির মতে, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য ইসিকের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা শুধুমাত্র অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নয়, বরং একটি বৈষম্যমূলক নীতি গড়ে তুলছে। একই সুবিধা যদি দেশীয় পর্যবেক্ষকদের দেওয়া না হয়, তবে তা সমতা ও ন্যায়বিচার নীতির বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান জোর দিয়ে বলেন, যদি ইসিক বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য বাসস্থান ও খাবারের খরচ বহন করতে পারে, তবে কেন দেশীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য একই ব্যবস্থা করা হয় না? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি ন্যায়সঙ্গত বলা কঠিন।
বহিরাগত পর্যবেক্ষকদের উপর আর্থিক সহায়তা প্রদান করলে তারা সরকারী সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত সুবিধার কারণে ‘ভাড়া নেওয়া এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে তাদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমত গঠনে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে।
টিআইবি আরও উল্লেখ করে, এমন সহায়তা গ্রহণের ফলে পর্যবেক্ষকরা ইসিকের হসপিটালিটি থেকে স্বস্তি পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন মূল্যায়ন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। স্বার্থসংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিশ্লেষণকে অবিশ্বাসের চোখে দেখা হতে পারে।
টিআইবির দৃষ্টিতে, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যে তারা কী ভিত্তিতে ইসিক বা সরকারের আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে তাদের দায়িত্ব পালন করতে ইচ্ছুক। এই ধরনের আর্থিক সহায়তা গ্রহণের ফলে নৈতিক মানদণ্ড ও স্বার্থসংঘাতের দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উচিত ইসিকের আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা এবং তাদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করা। এভাবে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের বিশ্লেষণকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারবে।
টিআইবি উল্লেখ করে যে, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। ইসিকের এই সিদ্ধান্তের ফলে সম্পদ ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সমালোচনার পর ইসিকের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যদি ইসিক টিআইবির উদ্বেগের প্রতি সাড়া না দেয়, তবে ভবিষ্যতে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসের হ্রাস ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, টিআইবির এই অবস্থান দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইসিকের সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা বা সংশোধন না হলে, ভবিষ্যতে একই ধরনের বিতর্কের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, টিআইবি ইসিকের বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানকে অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক এবং স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে এই সহায়তা প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়েছে।



